মনি হায়দার
ঢাকা, বাংলাদেশ
_____
এক
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শমশের আলী ঘুম থেকে উঠেই অনুভব করলেন, কী একটা নেই! মুখটা খালি খালি লাগছে। কেন লাগছে? কী নেই তাঁর? টাকা পয়সা? গাড়ি বাড়ি? নারী? ক্ষমতা? সব, সবই আছে। কিন্তু সকালে চোখ খুলেই কেন মনে হচ্ছে, কী জানি একটা নেই।
কী নেই?
স্ত্রী রাজিয়া বেগমের সঙ্গে চিৎকার করে জানতে চাইলেন, ‘আমার কী নেই?’ কিন্তু শমশের আলী অবাক হয়ে গেলেন, যখন অনুভব করতে পারলেন তিনি কথা বলতে পারছেন না। বিস্ময়কর ঘটনা, রাজনীতি করতে করতে, মাঠে ময়দানে লাখো জনতার সামনে দুই হাত উর্ধ্বে তুলে বাজখাঁই গলায় কতো কথাই তিনি বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাকে হারিকেন মার্কায় ভোট দিলে আমি এই অঞ্চলের সকল দরিদ্র মানুষের দারিদ্র্য দূর করে দিন দুপুরে হারিকেন জ্বালিয়ে দেব।’ নির্বাচনী এলাকা এক হাজার বারোর জনগণ শমশের আলীর জোরালো তীক্ষ্ণ কথায় বিশ্বাস করে বিপুলভাবে ভোট দিয়েছে। ভোট একবার নয়, দুই বার নয় তিন তিনবার ভোট দিয়েছে। এবং একবার প্রতিমন্ত্রীও হয়েছিলেন। এখন তিনি এক হাজার বারো অঞ্চলের নির্বাচিত প্রতিনিধি। মাননীয় সাংসদ। সংসদে তিনি যখন কথা বলেন, তখন মাইকের প্রয়োজন হয় না, এমনই তাঁর গলা আর জিহ্বার ধার।
সকালে উঠে সেই লোকটি অনুভব করলেন, সবই আছে। কেবল প্রিয় জিহ্বা নেই। কথা বলতে পারছেন না। খাবেন কী করে? সারা জীবনের জন্য খাবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল?
শোকে দুঃখে তিনি রান্নাঘরে গেলেন স্ত্রী রাজিয়া বেগমের কাছে। রান্নাঘরে, রাজিয়া বেগমের কাছে গিয়ে প্রিয় রাজনীতিক শমশের আলী দেখতে পেলেন, ত্রিশ বছরের প্রিয় স্ত্রী কাঁদছেন আর রুটি বানাচ্ছেন।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে? কাঁদছো কেন?’
স্ত্রী রাজিয়া বেগম মুখ হা করলেন, অবাক বিস্ময়ে শমশের আলী দেখলেন, প্রিয়তম স্ত্রীর মুখ গহ্বব্বের ভিতরে সবই আছে কেবল জিহ্বাটা নেই। তিনিও পাল্টা হা করলেন, স্ত্রী রাজিয়া বেগম ততোধিক বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলেন, মহান স্বামী গরীব খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সাংসদ শমশের আলীরও জিহ্বা নেই।
জীবনের, বিবাহিত জীবনের ত্রিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম একে অপরের মুখ দেখলেন পরিষ্কার। রান্নাঘরে ছুটে আসে ছেলে রাতিন, মেয়ে শারমিন শানু। দুজনেই কলেজে পড়ে। রান্নাঘরে ঢুকে রাতিন জড়িয়ে ধরে পিতা শমশের আলীকে। রাজিয়া বেগমকে জড়িয়ে ধরে শারমিন শানু। পুত্রকন্যা দুজনেই কাঁদছে। শমশের আলী আর রাজিয়া বেগম তাকায়, এবং তীব্র আবেগে কথা বলতে চান। কিন্তু জিহ্বাহীন মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। কেবল মুখ হা করেন। সঙ্গে সঙ্গে রাতিন আর শারমিন শানুও হা করে। চারজন মানুষের কারও জিহ্বা নেই। চারটে মুখের মুখগহ্বর দেখা যায়। চারজন, চারজনকে জড়িয়ে কাঁদছে।
মেয়ে শারমিন শানুর মুখ দেখার আগে শমশের আলী ভেবেছিলেন, ছেলেমেয়ের জিহ্বা ঠিক আছে। কিন্ত মুখগহ্বর দেখার পর বুঝতে পারলেন, পরিবারের কারো জিহ্বাই নেই। উৎখাত হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, জিহ্বা কখন উৎখাত হল? রাতে খাওয়ার সময়েতো জিহ্বা ঠিকই ছিল। চারজনে মিলে মুরগীর মাংস, রাজহাঁসের ডিম, মুসুরের ডালের চচ্চরি, ইচা মাছের সঙ্গে বেগুনের ভাজি- দারুণ খেয়েছিলেন। খাওয়ার পর বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ছোট ফ্রিজটা খুলে ইতালী থেকে আনা ভদকার বোতল খুললেন। ঢাললেন গ্লাসে। হেলান চেয়ারে দুলতে দুলতে পুরো এক গ্লাস খালি করে, আর এক গ্লাস কেবল নিয়েছেন, ঢোকেন রাজিয়া বেগম।
‘আবার শুরু করলে? বিকেলে না খেলে দুই গ্লাস? বসেন পাশে।’
হাসেন শমশের আলী, ‘তুমি এক পেগ খাবে?’
নির্নিমেষ কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকে, ‘তুমি আমাকেও তোমার সঙ্গী করতে করতে চাও?’ দুজনে হাসে। ‘ঠিক আছে দাও এক পেগ।’
দুই পেগ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন শমশের দম্পতী। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিপর্যয় গোটা পরিবার জুড়ে। শমশের আলী মোবাইলে ম্যাসেজ আসার, টিং টিং টিং শব্দ শুনে মেয়েকে ছেড়ে মোবাইল বের করেন। বেশ কয়েকটা ম্যাসেজ এসেছে। সংরক্ষিত আসন একচল্লিশের নার্গিস আরা মাহমুদ লিখেছেন, ‘শমশের? এ কী হল? কথা বলতে পারছি না। আমার, আমার পরিবারের কারো জিহ্বা নেই। কই গেল? কী হবে? জিহ্বা না থাকলে রাজনীতি কি করে করব?’
রাজনীতির পাড়ায় একটা চালু গল্প আছে, সাংসদ নার্গিস আরা মাহমুদের সঙ্গে সাংসদ, সাবেক মৎস ও পশুপালন প্রতিমন্ত্রী শমশের আলীর গোপন অভিসার চলছে।
নির্বাচনী এলাকা বারো থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, ‘ভাইজান- রাজধানীর খবর কি? আমাদের গ্রামে তো কারো জিহ্বা নেই। আমরা কেউ কথা বলতে পারছি না।’
রাজিয়া বেগমের বাপের বাড়ি থেকেও একই ম্যাসেজ আসছে। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে শমশের আলীর, ঘটনা কী? জিহ্বারা গেল কোথায়?
দুই
পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি রাফাতউল্লাহ ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকা নিয়ে বসেছেন। প্রমোশন পেয়ে ডিআইজি হওয়ার তালিকায় নাম আসবে আজ। তিনি দ্রুত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন, তারও অধিক দ্রুততায় খুঁজে দেখছেন প্রমোশনের তালিকা। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়…আঠারো পৃষ্ঠার সব উল্টালেন, কিন্তু কোথাও নামের তালিকা নেই। তিনি প্রচন্ড. ক্ষিপ্ত হয়ে উচ্চারণ করতে চাইলেন, হোয়াই?
কিন্তু তিনি অবাক হয়ে অনুভব করলেন, মুখ থেকে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছেন না। ঘটনা কী? তিনি দ্বিগুন উৎসাহে আবার উচ্চারণ করতে চাইলেন, হোয়াই? কিন্তু রেজাল্ট আগের মতোই, কোনো শব্দ নেই মুখের ভিতর। কেন? লক্ষ্য করলেন, মুখটা খালি খালি লাগছে। তিনি আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। মুখ খুললেন, অবাক হয়ে দেখছেন, মুখের ভিতরে জিহ্বা নেই। বিশ্বাস করতে পারলেন না, ধোয়াশা লাগছে ব্যাপারটা। রাফাতউল্লাহ পুলিশ ডিপার্টমেন্টের জাঁদরেল অফিসার। তার হুকুমে এক ঘাটে বাঘে গরুতে পানি খায় কিন্তু বাঘে ঘাড় মটকায় না গরুর। মটকাবার সাহসই পায় না। কারণ, এডিশনাল ডিআইজি রাফাতউল্লাহ ডান্ডা হাতে পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই রাফাতউল্লাহর প্রমোশনের তালিকা পত্রিকায় নেই! আরও অবাক কারণ, নিজের মুখের মুখরিত জিহ্বাটা নেই। কথা বলতে পারছেন না।
চাকরি পাওয়ার তিন বছর রাফাতউল্লাহ প্রশাসনে নির্বিরোধী সৎ ছিলেন। কিন্তু চারপাশের ঘুষখোরদের উৎপাতে আর একক থাকতে পারলেন না। ঘুষ খেতে শুরু করলেন। ঘুষ খাওয়া শুরু করার পর শরীর মনে দারুন একটা ফিলিং এসে যায়। কড়কড়ে টাকা আসতে থাকে ট্যাক ভরে। টাকার ভিন্ন রকম একটা জৌলুশ, অহংকার অনুভব করলেন তিনি। একই সাথে এক ধরনের খেদ তৈরী হল, গত তিন বছর নিজেকে এই জৌলুশ থেকে বঞ্চিত করলেন কেন? সেই তিন বছরের জৌলুশ পূর্ণ করবার জন্য, ঘুষ খাওয়া কমিটিকে পিছনে ফেলে তরতর এগিয়ে যাওয়ার জন্য রাফাতউল্লাহ চারগুন ঘুষ খাওয়া শুরু করলেন। অচিরেই পুলিশ সুপার হিসেবে অনেককে ছাড়িয়ে গেলেন। রাজধানী শহরের আশে পাশে কয়েক বিঘা জমি কিনলেন। ফ্ল্যাট কিনলেন তিনটি। দুটি ভাড়া দিলেন। অভিজাত এলাকার একটা আড়াই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে সপরিবারে থাকতে শুরু করলেন। এখন ডিআইজি হিসেবে ক্ষমতার পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে টাকা। টাকার হিসেবটা ঠিক মনে থাকে না তাঁর। এডিশনাল ডিআইজি পদে আছেন তিন বছর।
আর ভাল্লাগে না! প্রমোশন নিয়ে ডিআইজির আগে এডিশনাল বাদ দিতে চান। পুলিশ প্রশাসনের বড় কর্তার সঙ্গে চার কোটি টাকায় রফা হয়েছে। দুই কোটি টাকা গত সপ্তাহে চেকে পেমেন্টে করেছেন। গতকাল প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে প্রমোশন নিয়ে। সেই বৈঠকে চারজন এডিশনাল ডিআইজিকে ডিআইজি পদে প্রমোশন দিয়ে ফাইল মাননীয়’র দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। মাননীয়র দপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন দেশী কর্মকতা জানিয়েছেন গত রাতে মোবাইলে, আপনাদের ফাইলে মহান মাননীয় সিগনেচার করেছেন। আমি নিজে ফাইল নিয়ে গিয়েছিলাম।
তাই! উল্লাসে কাঁপে রাফাতউল্লাহর গলা। ‘বস, আপনাকে বিদেশে পাঠাব। বলেন, কোন দেশে যাবেন?’
‘মানে?’
‘আপনি এতবড় একটা খবর দিলেন আর আপনার জন্য এটুকু করব না? বলেন কোন দেশে যেতে চান? মালয়েশিয়ার চেয়ে থাইল্যান্ডে সুযোগ সুবিধা অনেক বেশী। বিশেষ করে মেয়েমানুষের সুযোগের কোনো শেষ নেই। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না বস, কতো ধরনের মেয়েমানুষ পাওয়া যায় একদম হাতের মুঠোয়, আর কত সুখ করার আছে। আমি তো দুই মাস পরপর যাই। না গেলে আমার ভালো লাগে না। এখন আপনি বলুন, কবে যাবেন?’
‘অত টাকা আমি কোথায় পাব?’
‘টাকা নিয়ে আপনি ভাবছেন কেন? যাবেন আপনি। টাকা দেব আমি। আপনি মাননীয়র অফিসে কতবড় দায়িত্ব নিয়ে আছেন। আপনার সেবা করা আমার দায়িত্ব ভাই। আমাকে আপনার সেবা করার সামান্য সুযোগ দিন। টাকা যদি এক কোটিও লাগে, আপনি ভাববেন না। দয়া করে সেবা করার একটা সুযোগ দিন।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনি যখন এত করে বলছেন, তখন নিশ্চয়ই যাব।’
‘আলহামদুল্লিাহ! ভাই, আপনি মেহেরবান। আগামী সপ্তাহেই আপনার যাবার ব্যবস্থা করি?’
হাসেন বড় ভাই, এতো উতলা হবার কি আছে। আগে আপনার প্রোমোশনের চিঠি হাতে পান, পরে দেখা যাবে।
‘আপনি যখন বলেছেন মাননীয় সই করেছেন, তখন আর আমার প্রমোশন ঠেকায় কে? প্রমোশন পেয়ে চেয়ারে বসি একবার, শালার উজবুক আহসানকে দেখিয়ে দেব, কতো ধানে কতো মুড়ি?’
‘কোন আহসান?’
‘ওই যে গানের শিল্পী। করে পুলিশের চাকরি, সমর্থন করে বিরোধী দলের রাজনীতি, আবার আমার সঙ্গে লাগতে আসে। এইবার দেখিয়ে দেব। আমাকে বলে অশিক্ষিত, বর্বর। আমি নাকি বাড়ি গাড়ি করেছি ঘুষের টাকায়। দরিদ্র মানুষের চামড়া রক্ত বিক্রি করে আমি টাকার পাহাড় গড়েছি।’
‘আরে বাদ দেন তো।’
‘বাদ দিই কী করে? আগের সরকারের সঙ্গে রাজনীতি করতে গিয়ে আমাদের সরকারের সময়ে পুটকি মারা খেয়েছে। সিনিয়র হয়ে আমি প্রমোশন পাচ্ছি, সহ্য হচ্ছে না। যা ইচ্ছে বলে বেড়াচ্ছে।’
‘কাল পত্রিকার পাতায় প্রমোশনের তালিকায় আপনার নাম দেখলে মুখ বন্ধ হয়ে যাবে।’ ওপাশ থেকে বলেন বড় ভাই। সত্যি বলেছেন বড় ভাই।
সকালে পত্রিকায় কোনো খবর নেই। শুধু কি প্রমোশনের খবর? নেই মুখের মধ্যে জিহ্বাটাও। ঘটনা কী? মোবাইলে একের পর এক ম্যাসেজ আসতে থাকে। সব ম্যাসেজ সহকর্মী বন্ধুদের। কারো মুখে জিহ্বা নেই। হায়, হায় এত মানুষের জিহ্বা কই গেল? আর গেল কখন? টেরই পেলাম না? কেউ কি টের পায়নি? আচ্ছা এটা, মানে জিহ্বা নির্বাসনের পিছনে বিরোধী দলের কোনো ষড়যন্ত্র নেই তো? হতে পারে। রাফাতউল্লাহ মোবাইলে ফোন করে অধস্তনদের তদন্ত করার নির্দেশ দিতে চাইলেন, কিন্তু কথা বলতে পারলেন না। ওপাশে রিং বেজে যাচ্ছে, রিংয়ে কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান বাজে, ‘খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।’ গান শেষ হওয়ার পর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এখন কী হবে?
পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি রাফাতউল্লাহ বিধ্বস্ত হয়ে বসে রইলেন।
তিন
মোবাইলে এ্যলার্ম দিয়ে রাতে ঘুমিয়েছিলেন হরিমোহন শিকদার।
সকাল সাড়ে ছ’টার এ্যালার্ম। দোকানে বিক্রিবাট্টা করে অনেক রাতে বাসায় ফেরেন শিকদার। খাওয়া দাওয়া সেরে টিভি দেখেন। বয়স্ক মানুষ। ষাট বছরের কাছাকাছি বয়স। চ্যানেলের নানা কিসিমের অনুষ্ঠান দেখতে দারুণ লাগে। কি উদোম আর উদ্দাম নাচ দেখায় নায়িকারা। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন নাচ দেখদে দেখতে- যৌবনের সময়ে এই সুখচাখবার সুযোগ ছিল না। তখন কেবল বেতারের গান আর নাটক শুনে সময় পার করতে হয়েছে। গোটা পর্দা জুড়ে খলবল করে কেবল জংঘা টুকু লুকিয়ে রেখে সবই দেখায় এই সময়ের পুতুল পুতুল নায়িকারা। নতুন একজন নায়িকার নাচ দেখতে দেখতে রিমোর্ট টিপে টিভি বন্ধ করে দিলেন হরিমোহন শিকদার। সুইচ টিপে লাইট বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে রইলেন। কিন্তু চোখে ঘুম আসছে না। বন্ধ বা খোলা চোখের সামনে ভেসে আসছে আগামীকাল সকালের কাজগুলো। নতুন ছেলেটাকে সুবিধার মনে হচ্ছে না। কী যেন নাম ছেলেটার? রিয়াজ? হ্যাঁ রিয়াজ। পাশের দোকানদার করম আলীর ভাতিজা। অনেক দিন ধরে বলছে করম আলী, ভাতিজা রিয়াজকে একটা কাজের জন্য, শেষ পর্যন্ত গোপন আখড়ায় ঢুকানো কি ঠিক হল?
মেসার্স লক্ষ্মীরানী ভান্ডার, চালতা বাজারের মোড়ে বিরাট মুদি মনোহারী দোকানের মালিক হরিমোহন। বাবা রবিমোহনের কাছ থেকে উত্তরাধিকার থেকে সূত্রে পাওয়া মেসার্স লক্ষ্মীরানী ভান্ডারকে এই অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ মুদি মনোহারি দোকান হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিতে পেরেছেন। দিনরাত্রি মুদি দোকানের সামনে ক্রেতা লেগেই থাকে। চালতাবাজারের অন্যান্য দোকানদারদের চেয়ে সব জিনিসের দামও একটু কম রাখেন হরিমোহন শিকদার।
বাবার সময় থেকে একটা প্রবাদ ছড়িয়ে আছে, মেসার্স লক্ষীরানী ভান্ডার ক্রেতাদের কখনো বাসী পচা মাল দেয় না। মেসার্স লক্ষ্মীরানী ভান্ডার সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত থাকলেও আসল গল্পের স্রষ্টা, হরিমোহন শিকদার। অত সকালে কেন উঠতে হবে? কারণ, সকালে উঠে যেতে হবে চালতাবাজার থেকে তেরো কিলোমিটার দূরে, নিজের গ্রামে, উজান গাঁওয়ে। উজানগাঁওয়ের নিজের বাড়িতে বিরাট বিরাট চালের আড়ত করেছেন দুটি। নিজেদের লোক ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না আড়তে। ব্যবসার পলিসি হিসেবে ঢোকাও উচিৎ নয়। কিন্তু ‘জিহ্বার মিছিল’ গল্পের স্বার্থে আমাদের বাধ্য হয়েই ঢুকতে হচ্ছে।
এখানে, মানে সকল বাজারের পুরোনো বোতল তেলের টিন কুড়িয়ে আনা হয়। ভেজাল জলে ধুয়ে পরিষ্কার করে, ভেজাল তেল ঢুকিয়ে মেসার্স লক্ষী ভাণ্ডারে গোপনে ঢোকানো হয়। তিন টাকার দ্রব্য ত্রিশ টাকায় বিক্রি করে দেদারসে মুনাফা লোটেন হরিমোহন শিকদার। পূজোর সময়ে মেসার্স লক্ষীরানী ভান্ডারের সামনে বিশাল সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে পূজোর ব্যবস্থা তো করেনই , সঙ্গে থাকে নাচ গান আর বিপুল খাবার দাবারের আয়োজন। মুসলমানদের পালা পার্বণে হরিমোহন দরিদ্র মুসলমানদের দান দক্ষিণা দিয়ে থাকেন। উজানগাঁও এলাকা ছাড়িয়ে মেসার্স লক্ষ্মীরানী ভান্ডার এবং হরিমোহনের নাম ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে।
হরিমোহন ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ে পুজো সারেন। পুজো সারতে সারতে বিধবা পিসি এক গ্লাস দুধ সামনে ধরেন। পিসির সামনে দাঁড়িয়েই ঢক ঢক শব্দে খেয়ে নেন দুধ। পিসির আঁচলে মুখ মুছে বাড়ির সামনে চলে আসেন। ততক্ষণে ড্রাইভার গাড়ি বের করেছে। গত ত্রিশ বছরের নিয়মিত অভ্যাস। গাড়িতে বসার সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার আসমান আলী ছেড়ে দেয়। গাড়ি চলে তীব্র বেগে। কিন্তু আজ ভোরটা হরিমোহনের জন্য তেমন ভাল হাল না। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে। চোখ মেলেই বুঝতে পারলেন হরিমোহন, দেরী হয়েছে। চারদিকে আলোর মেলা বসে গেছে। মোবাইল হাতে নিয়ে দেখছেন তিন বার এ্যলার্ম বেজেছে।
অবাক ঘটনা, আমি টের পাইনি? তিতিবিরক্ত হয়ে হরিমোহন ছুটলেন রান্নাঘরের দিকে পিসিকে বকার জন্য। কিন্ত তিনি দেখতে পেলেন পিসি রান্নাঘরের সামনে বসে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছেন।
‘ও পিসি! ‘
চিৎকার করে ডাকতে গেলেন হরিমোহন শিকদার, কিন্তু মুখ গহব্বর থেকে কোনো উচ্চারণ নেই। হরিমোহন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে আরও জোরে ডাকতে চাইলেন, কিন্তু কোনো শব্দ বের হল না। নিজের উপর ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইলেন, পারলেন না। উচ্চারণ হীনতায় হরিমোহন ভাঙা কুলোর মতো পিসির সামনে লুটিয়ে পড়লেন। পিসি দু’হাতে হরিমোহনকে আঁকড়ে ধরে আকুল কাঁদছেন, মুখ হা করে। পিসির মুখের ভিতরে তাকিয়ে জিহ্বাহীন বীভসৎ মুখ দেখে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলেন। পিসি ছেড়ে দিয়ে আঙুলের ইশারায় হরিমোহনকে নিজের মুখ দেখতে বললেন। নিজের মুখ তো দেখা যায় না। হরিমোহন ব্যবসায়ীজ্ঞানে বুঝলেন, বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। অনুভব করলেন মুখের ভিতরে কোনো জিহ্বা নেই। হঠাৎ, এক হাত দূরে মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে থাকা বাঘ দেখে মানুষ যেভাবে চমকে ওঠে, দিশেহারা হয়, হরিমোহন শিকদার সেই রকম দিশেহারা হলেন। পিসির পায়ের উপর কাঁকর মেশানো চালের বস্তার মতো লুটিয়ে পড়লেন।
‘হায় হায়, এ কী বিড়ম্বনা! কোথায়? কোথায় গেলো আমার জীহ্বা? এতো সাধের আর রাজত্বের জীহ্বা? জীহ্বা ছাড়া আমি লক্ষ্মীরানী ভান্ডার চালাবো কীভাবে? আমার ভান্ডারের কি হবে?’ জিহ্বা যে কতো গুরুত্বপূর্ণ, হরিমোহন শিকদার বুঝলেন এক লহমায়, যখন মুখের ভিতরে জিহ্বা নেই।
‘হায় জিহ্বা? কই গেলে তুমি!’
চার
ব্যাগটা শক্ত হাতে ধরে ডাক্তার হাফিজুর রহমান গাড়িতে উঠে শরীর ছেড়ে দিলেন সীটে। নরম সীটের ভেতরে শরীর সেধিয়ে যায়। ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত একটা আঠাশ মিনিট। হাই তুললেন। ব্যগটাকে আরও কাছে টেনে নিলেন। চোখ বুঝলেন। গভীর রাতে রাস্তা পরিষ্কার।গাড়ি চলছে দ্রুত। বাড়ি পৌঁছুতে লাগবে আধঘন্টা। শহরের মূল কেন্দ্রে হাফিজুর রহমানের বিশাল চেম্বার। সরকারি মেডিকেল কলেজের তিনি প্রফেসর। সামনে ড্রাইভারের পাশে বসা হারুণ। হাফিজুর রহমানের সকল কাজের কাজী।
‘হারুন?’
‘স্যার?’
‘আজকে রোগী কতজন এসেছিল?’
বিরানব্বই জন স্যার।
‘টাকার হিসাব ঠিকঠাক নিয়েছো?’
নিয়েছি স্যার।
‘কত টাকা হয়েছে?’
‘বারোশো করে বিরানব্বই জন রোগীর কাছ থেকে মোট টাকা এসেছে – এক লক্ষ দশ হাজার চারশত টাকা।’
‘সব টাকা এই ব্যাগে?’
‘স্যার, দারোয়ান, মালি, ক্লিনার – ওদের টাকা দেয়ার কথা ছিল আজ।’
‘মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো প্রফেসর হাফিজুর রহমানের, কত টাকা দিয়েছো?’
‘স্যার, পনেরো হাজার টাকা। পাঁচ হাজার করে তিন জনকে।’
তুমি একটা গাধা। কোন আক্কেলে তুমি এক লাখ টাকা ভাঙ্গলে? ওদেরকে আজকে না দিয়ে কালকে দিলে কী হত? বাসায় আমার পুরো এক লাখটাকা যেত।সামান্য বুদ্ধিটাও মাথায় নেই তোমার?’
গাড়ি চলছে সাই সাই ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে। সামনের সিটে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে হারুন। চোখ সামনে থাকলেও হারুনের দৃষ্টি কঠিন। দারোয়ান, মালি, ক্লিনারের আয় খুব সামান্য। ঠিক সময়ের প্রায় নয় দিন পর টাকাটা দিলাম, তবুও স্যারের…। ভেতরে অসহায় অস্বস্তি বোধ করে হারুন।
‘হারুন?’
‘স্যার?’
‘আজ কতটা টেস্ট পাঠিয়েছি?’
‘একশো একত্রিশটা।’
‘বিরানব্বইজন রোগী, মাত্র একশো একত্রিশটা টেস্ট দিয়েছি? কম হয়ে গেল না? প্রত্যেক রোগী প্রতি চারটা থেকে পাঁচটা টেস্ট দেয়া উচিৎ ছিল।তুমি ইশারা করে বা ফোনে তো বলতে পারতে, টেস্ট কম হয়ে যাচ্ছে। সবকথা যদি আমাকেই বলতে হয়, তাহলে তোমাকে রেখে আমার লাভ কী?’
‘আর ভুল হবে না স্যার।’
বিশিষ্ট বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ ডা হাফিজুর রহমান দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন। কপালের উপর ডানহাতটা রেখে কর্কশ কণ্ঠে বলেন, ‘তোমাকে অনেকবার বলেছি। তুমি আমার কথা গ্রাহ্য করো না। দেখি কী করা যায়!’
গাড়ি বাড়ির ভেতরে ঢোকে। চঞ্চল হয়ে ওঠেন তিনি। বাড়িতে তিনটি জার্মান শেফার্ড কুকুর পোষেন তিনি। কুকুরগুলো দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পরে ডাক্তারের উপর। গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়াতেই কুকুরগুলো এসে টকটকে লাল জিহ্বা বের করে প্রফেসরের শরীর শুকতে থাকে। একটা কুকুর দুপায়ে ভর দিয়ে লম্বা হয়ে প্রভুর মুখের কাছে নিয়ে যায় মুখ।
আলতো আদর করেন প্রফেসর হাফিজুর রহমান, চল চল। ভেতরে চল। তোদের জন্য ফ্রান্স থেকে বানরের মাংস আনিয়েছি। চল খাবি।
প্রফেসর ডাক্তার বক্ষব্যাধী বিশেষজ্ঞ দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলে, পেছনে পেছনে কুকুরগুলো টকটকে লাল জীহ্বা বের করে অদ্ভুত হাস হাসহাস শব্দ তুলে যেতে থাকে। বিরাট দরজা পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরদের পালক জয়রাম পোদ্দার তিন গামলা বানরের মাংস সামনে রাখে। কুকুরগুলো বানরের মাংসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রফেসর ডাক্তার হাফিজুর রহমান দাঁড়িয়ে প্রিয় কুকুরদের মাংস খাওয়া দেখেন।একটা কুকুর এক টুকরো মাংস মুখে নিয়ে প্রফেসরের দিকে যেতে শুরু করলে, প্রফেসর দৌড়ে সিঁড়ির উপর ওঠেন। কুকুরটাও ওঠে। প্রফেসর দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেন। কুকুরটা মাংস দরজার রেখে এক লাফে নিচে, বানরের মাংসের কাছে চলে আসে।
প্রফেসর ডাক্তার বাথরুমে ঢোকেন। বাথ সেরে খেয়ে দ্রুত ঘুমুতে যেতে হবে। সকাল সাড়ে ন’টায় একটা কল আছে। গেলেই দশ হাজার টাকা।কোনোভাবেই দশ হাজার টাকার এই কল মিস করা যাবে না। তিনটা বেসরকারী হাসপাতাল ভিজিট করার কথা আছে। সাতজন রোগী। একেকজনের জন্য ভিজিট চার হাজার টাকা। মাত্র একবার রোগীর বিছনার পাশে দাঁড়াবেন, জুনিয়ার ডাক্তারেরা পিছনে ইঁদুরের মতো সেটে থাকবে । ওদের ‘স্যার’ ‘স্যার; শুনতে শুনতে রুগীর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে চার্টটায় এক বার দৃষ্টি রাখবেন, মনে হলে রোগীকে দু’ একটা প্রশ্ন করবেন, ব্যাস…। টাকা আসতে থাকবে। দুপুরের পর একটার সরকারী হাসপাতাল মানে চাকরিস্থলে যাবেন। যাবেনই। কর্মক্ষেত্রকে তো আর ফাঁকি দেয়া যায় না। দায়িত্ব বলে একটা…। প্রফেসর ডাক্তার হাফিজুর রহমান কখনো দায়িত্ব এড়াতে চান না।
দ্রুত কয়েকটা দানা মুখে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠলেন প্রফেসর ডাক্তার হাফিজুর রহমান। দরজা খুললেন। তিনি অবাক, কুকুর তিনটে নেই। গত আট নয় বছরের ঘটনা, ঘুম থেকে উঠে দরজা খুললেই কুকুর তিনটি তীব্র ঘেউ ঘেউ শব্দে উপস্থিতির জানান দিয়ে, জিহ্বা দিয়ে পা চেটে দেয়। কুকুরের পা চেটে দেয়া তিনি দারুণ উপভোগ করেন। অনেকটা মেয়ে মানুষের শরীর রমনের মতো আরাম। কিন্তু কোথায় কুকুর? এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন, কুকুর তিনটি গেটের দিক থেকে দৌড়ে আসছে। কিন্তু কোনো শব্দ নেই। প্রফেসর খুব অবাক। কুকুর দৌড়ে আসছে, অথচ কোনো শব্দ বা ঘেউ ঘেউ করছে, এটা অসম্ভব ঘটনা। বিশেষ করে, এই কুকুর তিনটির ব্যপারে তিনি তো সব জানেন।
কুকুর তিনটি দৌড়ে এসে পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লো ঠিকই কিন্তু পা চেটে দিচ্ছে না। তিনি রমনের সুখ পাচ্ছেন না। তীব্র চোখে কুকুরদের দিকে তাকালেন। কুকুর তিনটিও পাছার উপর ভর দিয়ে তাকাল প্রভুর দিকে। প্রভু কুকুর তিনটির মুখের দিকে তাকিয়ে হতভম্ব। কুকুর তিনটির জিহ্বা নেই।অবিশ্বাস্য এই দৃশ্য পান করে প্রফেসর হাফিজুর রহমান চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু চিৎকার করতে পারলেন না। মুহূর্ত মাত্র, অজানা ভয়ে, ত্রাসে শরীর কেঁপে ওঠে। তিনি মুখের ভিতরে হাত ঢুকালেন, নেই! নেই কোনো জিহ্বা মুখে। আবার ঢোকালেন, আবার এবং আবার। কিন্তু ফলাফল একটাই, মুখের ভিতরে জিহ্বা নেই। প্রফেসর দৌড়ে বেডরুমে প্রবেশ করলেন, মোবাইল হাতে নিলেন। মোবাইলে প্রায় পঞ্চাশটা ম্যাসেজ এসেছে। সবই পরিচিত ডাক্তারদের। একটাই প্রশ্ন, তোমার কী জিহ্বা আছে? আমারটা, বৌয়েরটা, সন্তানেরটা কারো নেই।
প্রফেসর ডাক্তার হাফিজুর রহমান বিছনার উপর বসে পড়লেন। জিহ্বা নেই কেনো? ডাক্তার এবং ডাক্তারদের পরিবারের মানুষদের জিহ্বা কোথায় গেল?
জিহ্বা ছাড়া রোগী কেমনে দেখবেন? রোগী না দেখলে কাড়ি কাড়ি টাকা কামাবেন কেমন করে? টাকার বিছানায় না ঘুমালে ডাক্তারের ঘুম আসে না। তাহলে? এক ধরনের আতংকে প্রফেসর ডাক্তার হাফিজুর রহমান ঘামতে ঘামতে আবার মুখের ভিতরে হাত দিলেন, জিহ্বা নেই। কোথায় গেল, কখন গেল, কিভাবে গেল জিহ্বারা?
পাঁচ
ধর্মগুরু ধ্যানে বসেছেন।
শহরের অত্যাধুনিক একটি প্রার্থনা গৃহ। অবশ্যই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। হাজার হাজার বছর আগে, ধর্মের প্রবক্তারা, যখন ধর্ম প্রচার করেছিলেন, তখন দুনিয়ায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। ধর্ম প্রবক্তাদের জীবনাচার অনুসরণকারীরা এখন এসি ব্যবহার করে। তো ধর্মগুরু বসেছেন সোজা হয়ে। চক্ষুদ্বয় মুদ্রিত। পিছনে অপেক্ষা করছে একজন পুরুষ, একজন নারী। ধ্যানের মধ্যে দিয়ে ধর্মগুরু জানবেন, এই অসামান্য সুন্দরী নারী রাতে ধর্মশালায় একা থাকবেন, নাকি সঙ্গের পুরুষও থাকার অনুমতি পাবে।
রুমটার চারপাশে নিরেট দেয়াল। কালো। জ্বলছে উজ্জ্বল নিয়ন আলো। সবকিছু ঝকমক করছে। কিন্তু চারপাশটা অদ্ভুত নীরব। দুপুরের দিকে যখন এই দম্পতি এসে ধর্মগুরুর আখড়ার সামনে রিকশা থেকে নামেন, তখন গোটা এলাকা জুড়ে প্রচুর মানুষের আনাগোনা দেখেছেন। বিরাট একটা প্রাসাদের মতো বাড়ি ধর্মগুরুর। গেটে আলখাল্লা পরিহিত দারোয়ান। হাতে বন্দুক। মুখ ভরা দাড়ি। কোটরগত চোখ দুটি তীক্ষ্ণ ।ফটক দিয়ে ঢোকার সময়ে দারোয়ান জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় যাবেন?’
স্বামী বলেন, ‘ধর্মগুরুর কাছে।’
‘কোথা থেকে আসছেন?’
‘উজানগাঁও থেকে।’
‘ঠিক আছে। যান।’
যাবার আগে পাশে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসা একজনকে দেখিয়ে বলে দারোয়ান, ‘ওনার সঙ্গে কথা বলুন।’
লোকটি টেবিলের উপর একটি রুলটানা মোটা মলাটের খাতা নিয়ে বসে আছে। থুতনিতে এক চিমটে দাড়ি। পিটপিট চোখে তাকায়। লোকটার সামনে বেশ কয়েকজন নারী পুরুষ অপেক্ষা করছে লাইন দিয়ে। এইমাত্র প্রবেশ করা নারী ও পুরুষ দাঁড়িয়ে গেলেন।
স্বামী ও স্ত্রী শুনতে পাচ্ছেন, লোকটির সওয়াল জবাব- সামনের লোকদের।
সেইভাবে জিজ্ঞেস করলো, এই স্বামী ও স্ত্রীকে, ‘রোগী কে?’
স্বামী- স্ত্রী পরস্পর তাকায়। স্বামী স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেন, ‘উনি। আমার স্ত্রী।’
‘নাম?’
‘মোসাম্মাৎ বেদানা বেগম।’
‘রোগ কী?’
আবার স্বামী- স্ত্রী পরস্পর তাকায়। স্ত্রী পাথরের মুখ করে অন্যদিকে মুখঘুরিয়ে নেয়। ধমক দেয় লোকটি, ‘রোগ বলতে দেরী করছেন কেনো? দেখতে পাচ্ছেন না, পিছনে কত লোক লাইন ধরে আছে?’
স্বামী ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলেন, ‘আমার স্ত্রীর বাচ্চা হয় না।’
সঙ্গে সঙ্গে লোকটি পিটপিট চোখ তুলে তীব্র দৃষ্টিতে তাকায়, এক নজরে জরীপ করে নেয় মোসাম্মাদ বেদানা বেগমকে। স্বামী খুব বিব্রত দৃষ্টিতে লোকটির চোখ, চোখের ভেতরের চোখ দেখতে থাকে।
লোকটির মুখ এক টুকরো লবণাক্ত হাসি দেখা যায়, ‘ঠিক আছে।আপনারা বাতেনী ঘরে যাবেন।’
‘বাতেনী ঘর?’
‘ধর্মগুরু নিজে যে ঘরে সেবা করেন, রোগী দেখেন – সেই ঘরের নাম বাতেন ঘর।’
‘এই ছাদাম?’ একটা কালো কুচকুচে লোক এসে দাঁড়ায়। মুখ থেকে পানের লাল পিক বেয়ে নামছে। লোকটার মুখ দেখে স্বামীর তীব্র ঘৃণা জাগ্রত হয়। কিন্তু কিছু করার নেই। কালো লোকটি ইশারা করলে, ওর পেছনে যেতে শুরু করলে, ছাগলের দাড়িঅলা লোকটি কর্কশ গলায় বলেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন তোবারকের হাদিয়া না দিয়ে?’
স্বামী অনেকটা লজ্জিত ভঙ্গিতে পকেটে হাত ঢুকাতে ঢুকাতে জিজ্ঞেস, ‘কত টাকা?’
‘পাঁচ হাজার এক টাকা।’
স্বামী পকেট থেকে টাকাটা বের করে লোকটির হাতে দেয়। ছাগলের দাড়ি টাকাটা হাতে নিয়ে গোনে। গোনা শেষ হলে, কুতকুতে একটা হাসি দেয়। স্ত্রী স্বামীর হাত ধরে। দুজনে কালো কুচকুচে লোকটির পিছনে পিছনে হাঁটতে থাকে। তিন তলার সিঁড়ি পার হয়ে চারতলায় উঠে একটা রুম দেখায়, ‘এইখানে থাকেন। ধর্মগুরুর প্রধান সহচর আসবে। রুমের মধ্যে সব আছে। আপনারা বিশ্রাম নেন।’
লোকটা চলে যায়, স্বামী এবং স্ত্রীঘরের মধ্যে ঢোকে। প্রশস্ত রুম। সুন্দর সাজানো। চেয়ার টেবিলের সঙ্গে খাটও আছে একটা। সুদৃশ্য খাট। স্বামী স্ত্রী ক্লান্ত কিছুটা। বসে দুজনে।একজন নারী ঢোকে এক হাতে একটা প্লেট নিয়ে। প্লেটে আম, আনারস, নাসপতি কেটে সাজিয়ে রাখা। অন্যহাতে বড় একটা গ্লাস রাখে টেবিলের উপর।
‘আপনারা খান। বিশ্রাম নেন। রাতে ধর্মগুরু আপনাদের সঙ্গে বসবে।’
সারাদিন অপেক্ষার পর রাতের প্রথম পর্বে এসেছে ধর্মগুরু।
ধ্যান করতে করতে ধর্মগুরু হঠাৎ অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারণ করে মূর্ছিত গেলেন। ধর্মগুরুর শরীর মেঝের উপর সটান, সোজা। পাশের রুম থেকে কালো আলখাল্লা পরিহিত একজন নারী এসে ধর্মগুরুর মাথার কাছে বসলেন। কপালের উপর পর পর তিনবার চুমু খেলেন। আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা পিতলের চকচকে ঘড়া বের করে ধর্মগুরুর মাথার উপর ঢেলে দিলেন পানি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ মেলে তাকালেন তিনি। আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা সাদা রঙের টাওয়াল বের করে ধর্মগুরুর মাথা মুখ মুছে দিয়ে, আবার পর পর তিনবার চুমু খেয়ে নারী দ্রুত চলে গেলেন পাশের রুমে।
সঙ্গে সঙ্গে ঢুকলো তিনজন নারী। তিনজনের আলখাল্লা সাদা। ধর্মগুরু মাথার ঝাকরা চুলে উপরে নীচে, ডানে বামে ঝাড়া দিয়ে তাকালেন, সামনে দাঁড়ানো অসম্ভব সুন্দরী একজন নারী আর একজন পুরষের দিকে। তাকিয়ে থাকতেই থাকতেই ধর্মগুরু বলে, ‘এই রুমে আমি আরএই নারী ছাড়া কেউ থাকতে পারবে না। ধ্যানে আমার গুরু আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন। যদি থাকে, আমার মন্ত্রে কোনো কাজ হবে না।এখনই সিদ্ধান্ত দিতে হবে, এখনই।’
পুরুষ তাকায় নারীর দিকে। নারী কাঁপছে।
ধর্মগুরু চিৎকার করে, ‘সময় নাই। দুজনে গেলে এখনই যাও। নইলে পুরুষটা চলে যাও…। কাল দুপুরের পর আমার বাড়ির গেটে আসলে তোমার স্ত্রীকে পাবে, সহি সালামতে। পবিত্রভাবে। বিশ্বাস রাখতে হবে। বিশ্বাসে মিলবে সন্তান, অবিশ্বাসে পাবে কষ্ট আর হাহাকার।’
পুরুষ স্ত্রীর হাত ছেড়ে চলে যায়। অন্ধকূপে স্ত্রী আরও কাঁপছে। কক্ষের ভেতরে ঢোকে দুই নারী। একজনার হাতে একটি গ্লাস। গ্লাসটি নিয়ে ধর্মগুরুর কাছে যায়। ধর্মগুরু চক্ষু মুদ্রিত করে গ্লাসে ফু দেয়। ফু মিশ্রিত গ্লাসের পানি এনে নারীর মুখের সামনে ধরে, ‘খাইয়া হালান। খাইলে ভালো লাগবে।’
‘আগন্তুক নারী কম্পিত মুখে পানিটুকু খেয়ে নেয়। পানি পান করানো নারীর মুখে হাসি ফোটে। দ্বিতীয় নারী আগন্তক নারীর হাত ধরে পাশের রুমে নিয়ে যায়। বসায় খাটে। আগন্তক নারীর শরীর ঝিম ঝিম করতে থাকে। কয়েক মুহূর্ত মাত্র, আগন্তক নারী বিছানার উপর শুয়ে পড়ে। ধর্মগুরু দরজায় এসে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে বসে আগন্তক নারীর পাশে। তাকায় গভীর আগ্রহের সঙ্গে, ‘বাহ সুন্দর।’
ইশারা করলে ধর্মশালার অন্য নারী দুজন চলে যায়। ধর্মগুরু লেলিহান জিহ্বা দিয়ে চাটতে শুরু করে আগন্তক নারীর শরীর। আগন্তক নারীর চেতনা নেই। কিন্তু দূরাগতভাবে শরীরের ভেতরে এক ধরনের রসায়ন অনুভব করতে পারেন। ধর্মগুরু কয়েকবার উপগত হবার পর, গেটের ছাগলা দাড়িও যুক্ত হয়।
ছাগলাদাড়ি অব্যর্থ পুরুষ। রাতের অন্ধকারে যেসব সন্তানহীন নারীরা এখানে আসেন সন্তানের আশায়, সেইসব নারীদের উপর নিবিড় গোপন আগ্রাসন চালায়, ধর্মগুরু এবং সঙ্গীরা। নারীরা বুঝতে পারে কিন্তু একটি সন্তান বা সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের বমন নিজেই গিলে ফেলে।
পরের দিন দুপুরে নারীর স্বামী ধর্মগুরুর প্রাসাদের গেটে স্ত্রীর অপেক্ষায় থাকে। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী ভেতর থেকে আসে। স্ত্রীকে হেরেমের আশ্রিত নারীরা গোসল করিয়ে, গরুর মাংস দিয়ে ভাত খাইয়ে একটু সাজিয়ে দিয়েছে। স্ত্রী সামনে এসে দাঁড়ালে, স্বামী হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি ভালো আছো?
বিক্রি হয়ে যাওয়া শরীরটাকে ধরে রাখতে রাখতে জবাব দেয় স্ত্রী, ভালো আছি। চলো। হাত ধরে স্বামীর।
ধর্মগুরু এবং সঙ্গীরা হিসেব করেছে, তাদের ঔরসে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ তৈরী হয়েছে।
পরের সকালে ধর্মগুরুরা দেখলেন, পরম প্রিয় জিহ্বা নেই। কেউ কথা বলতে পারছেন না। হাপুস নয়নে কাঁদছে, কাঁদছে আর গড়াগড়ি খাচ্ছে। জিহ্বা না থাকলে সব ব্যবসা চিরকালের জন্য বন্ধ। উপায়? জিহ্বা কোথায় গেল? কেনো গেল? কীভাবে গেল? কখন গেল? ধর্মগুরুরা বিষন্ন, বিপন্ন।
ছয়
যেহেতু জিহ্বা নেই। কথা বলা যায় না। কথা বলাও হয় না। সব কথা হয় মোবাইলে ম্যাসেজ অপশনে, আর টিভির স্ক্রলে। মোবাইলের ম্যাসেজ এবং টিভির স্ক্রলে লেখা উঠেছে, সব জিহ্বা জমায়েত হয়েছে শহরের সত্যমাঠে।
সত্যমাঠে?
সাত
সত্যমাঠে সমবেত জিহ্বারা ভাগ ভাগ হয়ে মিছিল আর সমাবেশ করছে।জিহ্বার মালিকেরা জিহ্বা পাওয়ার আশায় হাজারে হাজারে, লাখে লাখে জমা হয়েছে সত্যমাঠে। কিন্তু জিহ্বাদের সমাবেশের জন্য ঢুকতে পারছে না সত্য মাঠের ভেতরে। সমবেত সকলে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে জিহ্বাদের বিরাট বিশাল সমাবেশ দেখছে। যেদিকে চোখ যায়, জিহ্বা জিহ্বা আর জিহ্বা। এবং জিহ্বার গোড়া থেকে লাল টাটকা রক্ত পরছে ফোটায় ফোটায়…।
রাজনীতিবিদদের জিহ্বারা বলছে, আমরা যাদের মুখে ছিলাম, তারা, সেই রাজনীতিবিদরা এতটা সত্যনিষ্ঠ, এতটা জনদরদী, এতটা সৎ আর নির্লোভ, যে আমরা তাঁদের সততা সহ্য করতে না পেরে এই সত্য মাঠে চলে এসেছি। আমরা আর ওদের সঙ্গে থাকব না। থাকলে ওদের কথিত সত্যের চাপে আমরা পঁচে যবো। গলে যাব।
নির্বাক রাজনীতিবিদরা হতবাক হয়ে শোনে জিহ্বাদের রাজনীতি।রাজনীতিবিদরা আর্তনাদ করতে চায়, বলতে চায়, সত্যমাঠে সমবেত জিহ্বারা মিথ্যা বলছে। আসলে আমরা কপট, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রীক, মিথ্যুক, জনগণের সম্পদ লুণ্ঠনকারী… আমরা ক্ষমা চাই, আপনারা আমাদের বিচার করুন…কিন্তু রাজনীতিবিদদের কোনো কথাই উচ্চারিত হয় না। যেহেতু জিহ্বা নেই…।
পুলিশদের জিহ্বা সমাবেশ করে বলছে সত্যমাঠে, আমরা পুলিশদের জিহ্বা। এই দেশের পুলিশেরা এতো সৎ, এত নির্লোভ, এত জনদরদী, দরিদ্র জনসাধারণের সঙ্গে এত মানবিক ব্যবহার করে, যা দুনিয়ার কোনো দেশে দেখা যায় না। আর ঘুষ? এই দেশের পুলিশেরা ঘুষ শব্দটাই জীবনে শোনে নাই। সেই পুলিশদের বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায়, টিভি চ্যানেলে, জনসাধারণেরা মিথ্যা দুর্নাম ছড়াচ্ছে, সেই দুর্নাম সহ্য করতেনা পেরে, প্রতিবাদে আমরা এই সত্যমাঠে চলে এসেছি।
জিহ্বাদের বচনে পুলিশেরা এমনিতেই নির্বাক, আরও নির্বাক হয়ে গেছে। কী বলছে জিহ্বারা সত্যমাঠে এসে? আমরা পুলিশেরা সৎ? জনদরদী? আমরা ঘুষ শব্দটাই শুনিনি? পুলিশেরা বুঝতে পারছে, লোভে পাপে আর ঘুষে এতোদিনের মুখ গহব্বরে পালিত জিহ্বারা মূলত বিদ্রোহ করেছে। আর ফিরে আসবে না মুখ গহব্বরে। পুলিশেরা হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছে, আর বলছে, আমরা আর… কিন্তু কেউ শুনছে না। শুনবেই বা কী করে? কোনো শব্দই তো উচ্চারণ করতে পারছে না।
দোকানদারদের জিহ্বারা সত্যমাঠ জুড়ে হাঁটছে আর বলছে, আমরা দোকানদারদের জিহ্বা। শত শত বছর ধরে আমরা দোকানদারদের মুখের ভেতরে থেকে বুঝতে পারছি, দোকানদারদের মতো এতো নির্লোভ আর মহৎ মানুষ আর নেই। ওরা, কোনো ক্রেতাকে কখনো মাপে কম দেয় না, পচা বাসী খাবার ক্রেতাদের দেয় না। কোনো দ্রব্যর দাম বেশী রাখে না।দোকানদারদের এই অবাক সততায় আমরা জিহ্বারা আড়ষ্ট, অতীষ্ঠ এবং বিপন্ন প্রায় আমাদের অস্তিত্ব। বাধ্য হয়ে আমরা সত্যমাঠে এসেছি, সৎ নির্লোভ দোকানদারদের কীর্তি দুনিয়াবাসীকে জানাতে।
জিহ্বার জন্য অপেক্ষারত দোকানদারেরা নিজেদের পক্ষে জিহ্বাদের নির্লজ্জ্ব সাফাই শুনে, মরমে মরে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে, সারা জনমের লালিত জিহ্বারা আজ সত্যমাঠে, উল্টো সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সমবেত জনতার সামনে, নিজেদের জিহ্বার বিরুদ্ধে একবারের জন্য হলেও সত্য বলতে চায় দোকানদারগণ, কিন্তু বলতে পারছে না। জিহ্বাতো নেই মুখে। কী করবে দোকানদারেরা? আকুল হয়ে জিহ্বাদের ডাকছে, কিন্তু জিহ্বারা শুনতে পাচ্ছে না…।
মুমূর্ষূ রোগীদের ভরসার বান্ধব ডাক্তার। সমবেত সুধী, আমরা মহান ডাক্তারদের জিহ্বা। ডাক্তারেরা কখনো রোগীদের জিম্মি করে না। ভিজিট নাম মাত্র মূল্যে নিয়ে থাকেন, কারণ ডাক্তারী একটা মহান পেশা। এই পেশার প্রতি সম্নান জানিয়ে, ডাক্তারেরা নিরাপরাধ রোগীদের জিম্মি করে কখনো কখনো সাতদিন আট দিন ধর্মঘট ডাকে না। অপ্রয়োজনে রোগীদের রোগ টেস্টের নামে কমিশন খায় না। সরকারী হাসপাতালে হাসিমুখে সব ডাক্তাররা দিনরাত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ডাক্তারদের এত সেবার পরও সাধারণ মানুষেরা ডাক্তারদের বিরুদ্ধে নানা বদনাম করে, আমরা ডাক্তারদের মুখের ভেতরে থেকে, আদরে যত্নে বড় হয়েছি।ডাক্তারদের অপমান সহ্য করতে না পেরে, আমরা সত্যমাঠে এসেছি।
ডাক্তাররা ব্যাকুল হয়ে জিহ্বাদের পিছনে দৌড়চ্ছে। আর চিৎকার করছে, ওগো প্রিয় জিহ্বারা ফিরে এসো। ফিরে এসো আমাদের মুখে। আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পেরেছি। কিন্তু জিহ্বারা বাতাসের সঙ্গে এতো দ্রুত ধায় যে, ডাক্তারেরা সত্যমাঠের ধুলোর মধ্যে হারিয়ে যায়।
এই জিহ্বা দিয়ে দুনিয়ার ধর্মবেত্তারা প্রতিদিন ধর্মশালায় সত্য বলে মানুষের সঙ্গে বিধাতার নিকট সম্পর্ক গড়ছে। জীবনে মিথ্যা বলতে শুনিনি আমরা। নিজেদের জন্য কোনো কিছু জমা না করে ধর্মবিদরা সব সাধারণ মানুষের জন্য নিবেদন করে দেয়। ধর্মের নামে প্রতারণা, অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি ঘৃণা ছড়ান না এরা। পরস্ত্রীর প্রতি কখনোই চোখ তুলে তাকান না। চিকিৎসার নামে নিঃসন্তান দম্পতির সংসারে নিজেদের সন্তান ঢুকিয়ে দেন না। কিন্তু এক অজানা কারণে মানুষ ধর্মবেত্তাদের ঘৃণা করে। আমরা সত্যমাঠে সমবেত সকলকে জানাতে চাই, ধর্মবেত্তারা অতি সৎ সজ্জন আর উপকারী। শুধু শুধু ওনাদের পিছনে লাগবেন না আপনারা।
জিহ্বা ফিরে পাওয়ার আশায় সত্যমাঠে উপস্থিত ধর্মবেত্তারা সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লজ্জায় আলখেল্লা দিয়ে মুখ ঢাকে। বুঝতে পেরেছে, সত্যমাঠের জিহ্বারা আর ফিরে আসবে না।
আট
জিহ্বাহীন আত্মপ্রতারক লোভী মিথ্যুক ধর্ষক মুনাফাখোর প্রাণীগুলো মুমূর্ষ বেদনায় দাঁড়িয়ে থাকে, যদি জিহ্বারা ফিরে আসে! কিন্তু জিহ্বারা মিছিল করে সত্যমাঠ পার হয়ে চলে যাচ্ছে দূরে, দূরে, বিরামহীন কোনো দেশে।
যে দেশ থেকে ফিরে আসে না কেউ।
_____
আমার মনে হয়েছে এই লেখাটি ধারাবাহিকভাবে লিখে গিয়ে একটা বড় উপন্যাসের চেহারা দেওয়া দরকার ছিল। লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।