প্রদোষ পাল
মেদিনীপুর ও কলকাতা
__________
মূলত গ্রামে আমার বড় হয়ে ওঠা। তবে অজ পাড়া গাঁ নয়। সড়ক পথকে কেন্দ্র করে গ্রামটি যথেষ্টই উন্নত ছিল। বিশেষ করে শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে আশেপাশের আর পাঁচটা গ্রামের থেকে বেশ আলাদা। তার অন্যতম কারণ বোধহয় আমাদের গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বিরল এবং ব্যতিক্রমী এই শিক্ষক মহাশয় রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু ওঁর যা প্রতিভা এবং শিল্প-বোধের পরিচয় পেয়েছি, আরও অনেক বড় পুরষ্কার পেতে পারতেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সে যুগে তেমন বেতন পেতেন না। মাস্টারমশাই তবু বিদ্যালয়টিকে নিজের বাড়ির থেকেও পরম যত্নে সাজিয়ে তুলেছিলেন। একপাশে ছোটো একটা ঘরে একা থাকতেন। নিজে রান্না করে খেতেন। স্কুলের বাগান পরিচর্যা, দেওয়ালে আলপনা, ওয়াল ম্যাগাজিন সব করতেন নিজের হাতে।
প্রতি সপ্তাহের শেষে শনিবার স্কুলের দাওয়ায় একটি করে নাটিকা হতো। ছাত্রছাত্রীরা স্কুলের স্বাভাবিক পোশাকে ‘অমল ও দইওয়ালা’, ‘ অবাক জলপান’ ইত্যাদি ছোটো ছোটো নাটক করতো। স্কুলের প্রার্থনা শুরুর আগে যার ওপর সে সপ্তাহের দায়িত্ব থাকত তাকে খবর পড়ে শোনাতে হতো। কার বাড়িতে চুরি হয়েছে, ছেলে হয়েছে, কে মারা গেছে, কে চাকরি পেয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি আঞ্চলিক খবর। খবর শেষে সেদিনের বৃষ্টিপাত মেপে বলতে হতো।
প্রত্যন্ত জায়গার একজন মাস্টারমশাই হয়েও এতো আধুনিকমনস্ক, জীবনবোধে পরিপূর্ণ সদা কর্মমূখর মানুষটির কথা মনে পড়লে এখন বিস্মিত হই! একজন মানুষের ছোঁয়ায় শুধু আমাদের নয় পাশের কয়েকটি গ্রামও বদলে সুন্দর হয়ে গিয়েছিল।

মাস্টারমশাই যা বেতন পেতেন তাতে সংসার চলত না, তাই তিনি রাত জেগে সাইনবোর্ড লিখতেন আর বিভিন্ন পুজোর মরশুমে ঠাকুর তৈরি করতেন। আশ্চর্য! বাড়তি রোজগার করলেও বৃত্তি পরীক্ষার জন্য প্রায় চল্লিশটি ছেলেমেয়েকে পড়াতেন সম্পূর্ণ বিনা বেতনে! ছুটির পর আমরা দেড় দু ঘন্টার জন্য বাড়ি গিয়ে আবার সন্ধ্যায় হ্যারিকেন নিয়ে স্কুলে আসতাম। সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের সন্ধ্যে থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মাস্টারমশাই পড়াতেন। মেয়েরা বাড়ি চলে যেত, কিন্তু ছেলেদের থাকতে হতো স্কুলে। ক্লাসের একপাশেই আমাদের বিছানাপত্তর রাখা থাকতো। রাত দশটার পর খেয়ে ঘুমোনো। ভোর তিনটায় মাস্টারমশাই ডেকে দিতেন। হ্যারিকেন জ্বালিয়ে আবার পড়তে বসা। ভাবলে অবাক হতে হয় এই পুরো সময় মাস্টারমাশাই আমাদের যা পড়াতেন তার জন্য একটা টাকাও নিতেন না। আজকের অধিকাংশ মাস্টারমশাইদের দিকে তাকান — স্বপ্ন মনে হবে। স্কুলের বেতন নেওয়ার পরও সকাল সন্ধ্যা টিউশনি পড়িয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি রোজগার করছেন। পেল্লাই বাড়ি হাঁকাচ্ছেন।
সেই মাস্টারমশাইয়ের হাত ধরেই প্রায় আমার ছবির জগতে আসা। আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ি, একদিন ক্লাসে আমার উপরের দাদার আঁকা একটা ছবি নিয়ে গিয়েছিলাম। ক্লাসের বন্ধুদের কিছু বলার আ্গেই তারা মাস্টারমশাইয়ের কাছে ঐ ছবিটি নিয়ে হাজির।
মাস্টারমশাই ভালো করে দেখে বললেন…বাঃ সুন্দর হয়েছে। তুই এঁকেছিস? কিছুটা ভয়ে মুখ দিয়ে কথা বেরলো না। মাস্টারমশাই বুঝলেন আমারই আঁকা।
বললেন — ছুটির পর থাকবি।

একটু ভয় পাচ্ছিলাম — কী পরীক্ষা নেবেন কে জানে!
ছুটির পর একটা ছবি দেখে আঁকতে দিলেন। সঙ্গে কাগজ পেন্সিল, রঙ সহ সব সরঞ্জাম।
একটু আধটু আঁকতাম, কোনো অসুবিধা হলোনা।
তারপর প্রায় প্রতিদিনই ছুটির পর কিছুনা কিছু আঁকতে দিতেন। দু এক ক্লাস উপরে ওঠার পর স্কুলের দেওয়ালে আলপনা থেকে ওয়াল ম্যাগাজিনের সমস্ত ছবি আঁকতাম। বিভিন্ন ঋতুতে প্রকাশ পেত ওয়াল ম্যাগাজিন। তাতেও আঁকতাম। এভাবেই মাস্টারমশাইয়ের তত্বাবধানে চর্চা শুরু।
ভেবে দেখুন সারাদিন স্কুলের সমস্ত দায়িত্ব সামলে কার দায় পড়েছিল আমাকে নিয়ে পড়ার? এতে ওঁর কী লাভ হয়েছিল? আমার যে কি হয়েছে সে আমিই জানি। মাস্টারমশাইয়ের অবদান জীবনে বলে বোঝানো সম্ভব নয়।
(ক্রমশঃ)
_____