সুগত সেনশর্মা
পাডুকা, কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র
যাঁর সৃষ্টির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই শিরোনাম, আশাকরি সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এজন্য আমাকে মার্জনা করবেন। লেখক আমি একেবারেই নই। আর মাতৃভূমির বাইরেও নয় নয় করে হয়ে গেল বহুদিন। বাংলা ভাষা চর্চা, বিশেষ করে লেখার অভ্যাস বহুদিন হল নেই। কিন্তু অগ্রজপ্রতিম নিউইয়র্কের ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় নাছোড়বান্দা। পার্থদা আমার কলকাতার স্কটিশ চার্চ স্কুলের সিনিয়র দাদা এবং আমাকে খুবই স্নেহ করেন। ওঁর অনুরোধেই কিছুটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার এই কলম, থুড়ি কীবোর্ড ধরা। যদি কোন ভুলত্রুটি হয়, হবেই, পাঠকগণ নিজগুণে দয়া করে ক্ষমা করে দেবেন।
উত্তর কলকাতার এক নিতান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। বাবা, মা দুজনেই শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যথাক্রমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেথুন কলেজের প্রোফেসর। আমি উত্তর কলকাতার স্কটিশ চার্চ স্কুলে পড়েছি। আর জি কর মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে কিছুদিন কলকাতায় কাজ করে বিদেশে আসি। প্রথমে আসি মধ্যবিত্ত বাঙালির এককালের স্বপ্ন, বিলেতে, মানে ইংল্যান্ডে, ছিলাম পাঁচ বছর। তারপর আমেরিকায় পদার্পণ নব্বই দশকের মাঝামাঝি। বেশ উথালপাথাল সময় গেছে ইংল্যান্ডে আর আমেরিকাতে। তারই সামান্য কিছু উদাহরণ, আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছি।
কলকাতায় বেড়ে ওঠার সময় ছিল সত্তর দশকের নকশাল আন্দোলনের সময়। অনেক রাজনৈতিক ওঠাপড়া, অনেক টালমাটাল অবস্থা দেখেছি। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, তারপর রাজীব গান্ধীর হত্যাকান্ডের ঢেউ দেখেছি । এরপর দেশ ছাড়ার পালা।
ইংল্যান্ডও তখন ঠিক নিস্তরঙ্গ নয়। প্রিন্সেস ডায়ানার গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরবর্তী সময়ের অস্বস্তি চলছে । একটু থিতু হয়ে বসতে না বসতেই আমেরিকায় আসার পালা।আসতে না আসতেই সেই ভয়াবহ ঘটনা, 9/11 এ নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়া। সবকটা দুর্ঘটনাই কিছু কিছু ছাপ আমার পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনে রেখে গেছে। আর মাঝে মাঝে ভেবেছি, আচ্ছা দুর্ঘটনা কি আমার পিছু ছাড়বে না!!
তবে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে গিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হল, এদেশের অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত অমায়িক এবং বন্ধু মনোভাবাপন্ন। আবার কিছু লোক সেরকম নয়। সংখ্যাটা ইদানিং দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাড়তির দিকে। সে ধরুন গুগল দেখে ডাক্তারের সঙ্গে এঁড়ে তর্ক করাই হোক বা সম্পূর্ণ অবান্তর বিষয় টেনে এনে আমাকে বিব্রত করার চেষ্টাই হোক। এই ব্যাপারটাতে মাঝে মাঝে আমি খুবই বিচলিত হয়ে যাই।আবার অভিজ্ঞতা এবং সহবতের দৌলতে সামলে নিই।
চিকিৎসক হিসেবে নানারকম মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়। তাদের নানারকম সুখ-দুঃখের কথা তাঁরা আমাকে বলেন। সেটা একটা বিরাট প্রাপ্তি। বুঝতে পারি মানুষের জীবন একটা খোলা খাতার মত। আর আমি এটাও উপলব্ধি করেছি যে যেরকমই হোক না কেন, এক হাতেই গড়া সবাই যাবে এক জায়গায়। পৃথিবীর ভূগোল আলাদা হতে পারে, ভাষা আলাদা হতে পারে, দেশ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের সুখ-দুঃখ, বেদনা সবই যেন একই জায়গায় মিশছে এবং সেটা ভাগ করলে হালকা হওয়ার প্রবণতাটা সামুদায়িক। আমাদের দেশে যেরকম আমাদের দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন আছে, এদেশে সেটা অতটা দৃঢ় নয় ঠিকই, কিন্তু একেবারে যে নেই তা নয়। আবার আমাদের বাবা-মার সঙ্গে যতটা যোগাযোগ রাখতে পারি বা যতটা আত্মিক সম্পর্ক রাখতে পারি, এদেশে সেটা খুব বিরল। যদিও একেবারে নেই সেটা বলব না। তাও একজন বাঙালি হিসেবে, একজন ভারতীয় হিসেবে আমি যেভাবে বড় হয়েছি, এদের বড় হওয়াটা একেবারে অন্যরকম। আমার একটি মাত্র কন্যা, এদেশেই জন্ম, এদেশেই বেড়ে ওঠা। তাকে আমি আমার মূল্যবোধ দিয়ে যাবার চেষ্টা করেছি, এখনো করছি। জানি না কতদূর কি পেরেছি। তবে চেষ্টা তো নিশ্চয়ই করেছি।
জন্মভুমি আমাকে এখনও খুব টানে, আমি প্রতি বছরই সেই দেশে যাই। নিজের শিকড় আমি অবহেলা করতে পারিনা, নিজের আপনজনদের বেশী করে আপন মনে হয়। সবাই জানেন এখন আবার একটু টলমল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে এই দেশ। জানি না কোন দিকে যাচ্ছি। যদিও পেশাগত দিক থেকে যেটুকু সাফল্য পেয়েছি, তার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি এই বর্তমান কর্মভূমির কাছে অতীব কৃতজ্ঞ, কিন্তু আমি চিরকালই বাঙালি ছিলাম, আছি আর থাকবো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সেটাই কামনা।
এই যে পার্থদার প্রয়াসে এবং আপনাদের সকলের উৎসাহে প্রবাসী এবং দেশী অনেক লেখকের মনের আবেগ প্রকাশ হচ্ছে, এটাই আমাদের মতো প্রবাসী বঙ্গ সন্তানদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি। এতে অংশগ্রহণ করতে পেরে আমি খুব ই গর্বিত।
দেখুন, কোভিডের সময় অনেক পেশেন্টের মৃত্যু দেখেছি চোখের সামনে। মানুষ কত অসহায় তাও দেখেছি। কঠিন সময় পেরিয়েছি অনেক। তার পরও জীবন আবার চেনা ছন্দে ফিরেছে। এখনও চলছে। প্রবাসী জীবন প্রায় ত্রিশ বছর হতে চললো। তবুও এখনও আমি দেশকে খুব মিস করি। যখনই পারি যাওয়ার চেষ্টা করি। জানি না সামনে ভবিষ্যতে কী আছে। এদেশে থাকব নাকি ফিরে যাব? উত্তর খোঁজার অপেক্ষায় আছি, কতদিন থাকতে হবে কে জানে!
সবাই ভাল থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।