Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

আমার কথা

মালা মৈত্র

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

জীবনের অস্তবেলায় পৌঁছে পিছন ফিরে তাকালে দেখি,অনেক পেয়েছি। না পাওয়ার ঘর শূন্য।

কথা বলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছিল নাচ,গান শেখা।লেখাপড়া তো অবশ্যই। কিন্তু কোনো চাপ ছিল না। পড়াশোনার সঙ্গে কোনো সংঘাত ছিল না খেলাধূলা, সেলাই, নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, সিনেমায় অংশগ্রহণ করার।

আকাশবাণীতে নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে গিয়ে মনে হত যেন স্বপ্নপুরী। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থ ঘোষ, গৌরী ঘোষ, পরে জয়ন্ত চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে মনে হত – কত সুন্দর এঁদের বাচনভঙ্গি। ভাগ্যক্রমে আমার নাচের শিক্ষক — গুরু মণিশঙ্কর,গুরু রাজলক্ষ্মী ভেঙ্কটেশ্বর,গুরু ডেরেক মুনরো,গুরু গিরিধারি নায়ক — সবাই শিখিয়েছেন আমাদের সংস্কৃতি,আমাদের ঐতিহ্যের শিকড় কত প্রাচীন,কত গভীরে।

গানে আমার মা প্রথম গুরু। পরে আমার স্বামীর কাছে গান শিখতে গিয়ে সুর তালের সঙ্গে শিখেছি ভাষার গুরুত্ব। উচ্চারণে মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গুরু বিষ্ণুপুর ঘরানার সঙ্গীতাচার্য্য সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কী উচ্চ মার্গের মানুষ।  

স্কুলে গিয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে প্রার্থনা হত | শুনতাম- সৎপথে চলা, সত্যি কথা বলাই মনুষ্যত্ব | শিক্ষকরা ছিলেন আমাদের আদর্শ্ | আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করি এইজন্য যে তাঁদের শিক্ষা আমার জীবনের পাথেয় হয়ে উঠেছে |

পরবর্তী জীবনে আমিও আজ পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেলো নাচগানের শিক্ষকতা করছি | আমিও চেষ্টা করি আমার শেখা আদর্শে যেন আমার ছাত্রীরাও অনুপ্রাণিত হয় | বহু বছর পর যখন পুরনো ছাত্রীরা এসে বলে যে তারাও বাঙলার সংস্কৃতি , ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, তখন প্রভূত আনন্দ হয় |    

কিন্তু কিছুকাল থেকেই দেখছি আমাদের চারপাশের জগতটা কেমন বদলে যাচ্ছে | বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে | শহরে ইংরাজী মাধ্যম স্কুলের রমরমা বেড়েই চলেছে | তাতে কোন অসুবিধা নেই | কারণ সিলেবাসে বাংলাও পড়ানো হয় ভালমতো | কিন্তু ভয়ের কারণ হল কেউ আর বাংলা ভাষাকে মান্য করে না | 

“আমার মেয়ে বাংলাটা ঠিক জানে না” – এই কথা বলতে মায়েরা খুব গর্ববোধ করেন | ছেলেমেয়েদের প্রাণপণে উৎসাহ দিয়ে যান সব সময় ইংরিজীতে কথা বলতে | শুধু তাই নয়, বাংলাটাকেও ইংরাজী কায়দায় উচ্চারণ করাটা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে | বিজ্ঞাপনেও অনবরত অদ্ভূত বাংলায় কথা বলা হয় |

বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখি অদ্ভূত সব নাম রাখা হয়েছে | কিন্তু বাচ্চারা তার মানে জানে না | নামের উচ্চারণ করে ইংরাজীর মত করে | এই প্রসঙ্গে একটা  বাস্তব ঘটনা বলি |

একটি বাচ্চা প্রথমদিন স্কুল থেকে ফিরেই বলল-

“মা, ম্যাম আমাকে সোয়েটার  বলে ডাকে” |

“সোয়েটার? কেন?”

অবশেষে বোঝা গেল শ্বেতা (SHWETA) নামটি সোয়েটা হয়ে গিয়ে বাচ্চাটির কানে সোয়েটার হয়ে বেজেছে | হাস্যকর কিন্তু দুঃখজনক |

এরকম অজস্র উদাহরণ দেখে দুঃখ হয়, ভয়ও হয় | বাংলা ভাষা বাঁচবে তো? দুঃখ হয় এটা ভেবে যে এইসব বাচ্চাদের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের কোন পরিচয় হয় না | ওরা যে কী হারাচ্ছে ওরা নিজেরাই জানে না | অথচ বইমেলায় তো ভীড় হয়। কিসের জন্য? শুধুমাত্র আমাদের মত কিছু প্রাচীন মানুষের জন্য?

আমার মনে হয়, বাড়ীতে অভিভাবকগণ যদি বাচ্চাদের নিজের মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্বন্ধে অবহিত করেন, তবেই এই সঙ্কট থেকে আমরা মুক্তি পাব | নিজেদের ভাষা, নিজেদের সংস্কৃতিকে সম্মান না করতে পারলে বয়স হ্ওয়ার  আগেই মেরুদণ্ড ঝুঁকে পড়বে | ইংরাজী শেখার সঙ্গে তো বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করার কোন সম্পর্ক নেই | সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগে ইংরাজী ভাষায় স্বচ্ছন্দ হওয়া অত্যন্ত জরুরী | কিন্তু ইংরাজীতে কথা বলতে পারাই শিক্ষার প্রমাণ নয়।

প্রত্যেক মানুষের পরিচয় তার কাজে, স্বভাবে, মননশীলতায় |

Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Partha Banerjee
Partha Banerjee
11 months ago

চমৎকার লেখা। আরো লিখুন দিদি। 

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
1
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x