Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

সতত অপরিচিত: ঔপনিবেশিক কানাডায় অভিবাসীদের আত্মপরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি

মোহাম্মদ এহসান 

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা

কানাডা বহু সংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত। এখানে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে বসতি গড়েছে, কাজ করছে, সমাজ গড়ে তুলছে। কিন্তু এই বহুত্বের মাঝেও এক গভীর প্রশ্ন রয়ে যায় – একজন অভিবাসী, বিশেষ করে একজন অশ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি, কি সত্যিই এই সমাজের শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান বসতি-ঔপনিবেশিক (সেটলার কলোনিয়াল) জনগোষ্ঠির মতো সমান অংশীদার হতে পারেন? 

এই প্রশ্নটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি কাঠামোগত বাস্তবতার প্রতিফলন। বলাই বাহুল্য, কানাডার ঝুঁলিতে রয়েছে শত শত বছরের বর্ণবাদী বৈষম্যমূলক শাসনের ইতিহাস। এদেশে প্রাথমিকভাবে আসা ইউরোপিয়ান বসতি-ঔপনিবেশিক জনগোষ্ঠি আদিবাসীদের উপর যেমন চালিয়েছে নির্মম অত্যাচার, তেমনি করেছে ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসার মাধ্যমে আসা দাসদের উপর অমানবিক শোষণ। 

এ ধারা এখনো বহমান – আগের মত রূঢ় না হলেও – শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্যবাদের মাধ্যমে। কানাডায় নারীরা, আদিবাসীরা, চীন বা জাপানের অধিবাসীরা যেমন ভোটাধিকারও পায়নি সময় মত, তেমনি অভিবাসী হিসেবে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি ভারতীয় বা ইহুদি আশ্রয় প্রার্থীদের। ৯/১১ এর পর এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠির উপরও চলে চরম নজরদারি ও অযাচিত নির্মমতা। 

এই প্রবন্ধে একজন অভিবাসীর অভিজ্ঞতার আলোকে কানাডার সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈষম্য, অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনের পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ আলোচনার মানে এই নয় যে এখানে অশ্বেতাঙ্গরা ভালো নেই। অবশ্যই তাঁরা ভালো করছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে, কিন্তু বরাবরই অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বেশি কাঠ-খড় পুড়িয়ে! কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা তাঁদের এগিয়ে যাওয়ার পথে এখনো এক বড় সমস্যা। 

অভিবাসী পরিচয়: নাগরিকত্বের পরেও অপরিচিত

অনেক অভিবাসী বছরের পর বছর কানাডায় বসবাস করেন, নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, সমাজে অবদান রাখেন। তবুও তাঁদের পরিচয় প্রায়ই “নতুন আগন্তুক” বা “বিদেশি” হিসেবে থেকে যায়। গায়ের রঙ, উচ্চারণ, পোশাক বা সংস্কৃতিগত অভ্যাস তাদের আলাদা করে তোলে। এই পার্থক্য শুধু সামাজিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও গভীরভাবে প্রোথিত। শ্বেতাঙ্গ বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা গঠিত একটি সমাজে যারা সেই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের জন্য পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

সামাজিক সাংস্কৃতিক বর্জন

অভিবাসীরা প্রায়ই এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেখানে তাদের গ্রহণযোগ্যতা শর্তসাপেক্ষ। যতক্ষণ তারা প্রধান সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলেন, ততক্ষণই তারা “গ্রহণযোগ্য”। কিন্তু যখন তারা নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা বা পরিচয় প্রকাশ করতে চান, তখনই তারা “অন্য” হয়ে ওঠেন। এই দ্বৈত মানসিকতা অভিবাসীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে এবং মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে।

প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য কাঠামোগত বাধা

শুধু সামাজিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও অভিবাসীরা বৈষম্যের শিকার হন। শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো – সবখানেই এক ধরনের অদৃশ্য দেয়াল কাজ করে। অনেক নীতি ও আইন নিরপেক্ষ মনে হলেও, বাস্তবে সেগুলো বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে অভিবাসীদের জন্য নেতৃত্বে আসা, স্বীকৃতি পাওয়া বা প্রভাব বিস্তার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মানসিক চাপ পরিচয়ের দ্বন্দ্ব

এই বৈষম্য ও বর্জনের অভিজ্ঞতা অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একদিকে সমাজে মিশে যাওয়ার চাপ, অন্যদিকে নিজের সংস্কৃতি ধরে রাখার চেষ্টা – এই দ্বন্দ্ব প্রতিনিয়ত মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে। প্রতিদিনের ছোট ছোট বৈষম্য, মাইক্রো-আক্রমণ এবং নিজের অবস্থান প্রমাণ করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক অবসাদ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি করতে পারে।

নাগরিকত্বের সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি

অনেক অভিবাসী ভোট দেন, সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেন, নেতৃত্ব দেন। তবুও তাঁদের প্রায়ই “অতিথি” হিসেবেই দেখা হয়। তাঁরা যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন অনেক সময় তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হয়। বিশেষ করে যখন তাঁরা দেশের সহনশীলতা অথবা চিরাচরিত ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, তখন তাঁদের বক্তব্যকে “অসন্তোষজনক” বা “অসামঞ্জস্যপূর্ণ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

প্রজন্মান্তরের প্রভাব সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

এই প্রান্তিকতার প্রভাব শুধু প্রথম প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসী বাবা-মায়ের সন্তানেরাও প্রায়ই একই সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে। আত্মীকরণের চাপে তারা অনেক সময় নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা এক ধরনের সাংস্কৃতিক শূন্যতার মধ্যে বেড়ে ওঠে – যেখানে তারা না পুরোপুরি কানাডিয়ান, না পুরোপুরি তাদের পূর্বপুরুষের সংস্কৃতির অংশ।

প্রতিরোধ সহনশীলতার শক্তি

এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও অভিবাসী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সম্প্রদায়গুলো নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী সংহতি গড়ে তোলে। তারা গল্প বলে, শিল্পচর্চা করে, সংগঠন গড়ে তোলে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। এই প্রতিরোধ শুধু প্রতিবাদ নয়, বরং একটি বিকল্প বর্ণনার নির্মাণ – যেখানে তারা নিজেদের অস্তিত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি দাবি করে। এই প্রবন্ধটাও সেই প্রতিরোধের একটা অংশ, যা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যাকে তুলে ধরছে। 

পরিবর্তনের সম্ভাব্য পথ

সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায়বিচার অর্জনের জন্য সমাজে কিছু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। 

প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সংস্কার হওয়া খুব দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুলিশ ও কর্মসংস্থানে বর্ণবাদ-বিরোধী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত ইকুইটি অডিট চালু করতে হবে, যাতে বৈষম্য চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করা যায়। অভিবাসীদের শুধু অর্থনৈতিক অবদানকারী নয়, সমাজের সহ-নির্মাতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজে একটি মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে। স্কুলের পাঠ্যক্রমে আদিবাসী ইতিহাস, অভিবাসীর অভিজ্ঞতা এবং বর্ণবাদবিরোধী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি, জনসচেতনতামূলক প্রচারের মাধ্যমে বহুসংস্কৃতিবাদের ভুল ধারণা ভেঙে প্রকৃত বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরতে হবে। সরকারি কর্মীদের জন্যবাধ্যতামূলক সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও বৈষম্যবিরোধী প্রশিক্ষণ চালু করা উচিত।

তৃতীয়ত, প্রতিনিধিত্ব ও কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে হবে। সকল খাতে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিগত মিডিয়া ও শিল্পকে সরকারি সহায়তা দিতে হবে, যাতে প্রান্তিক কণ্ঠগুলো সামনে আসতে পারে। নীতি নির্ধারণে প্রভাবিত জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে হবে। অভিবাসীদের “অতিথি” নয়, সমাজের সহ-নির্মাতা হিসেবে ভাবতে হবে। সাংস্কৃতিক পার্থক্যকে দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি হিসেবে দেখতে হবে। শ্বেতাঙ্গ ও বসতি স্থাপনকারী জনগোষ্ঠীর সক্রিয় সহযোগিতা ও সমর্থন উৎসাহিত করতে হবে।

সবশেষে, ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। ব্যক্তিগত গল্প ও অভিজ্ঞতার আদান প্রদান করে সহানুভূতি ও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। স্থানীয় সংগঠন ও আন্দোলনকে সমর্থন করতে হবে, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হয়। বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ গড়ে তুলে সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার

কানাডায় নাগরিকত্ব পাওয়া মানেই সমাজে পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নয়। একজন অভিবাসীর জন্য সেই অন্তর্ভুক্তি প্রায়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায় – কারণ সমাজের কাঠামো এখনও বসতি-ঔপনিবেশিক অতীতের ছায়ায় পরিচালিত হয়। কিন্তু প্রতিরোধ, সংহতি এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। এই ভবিষ্যৎ শুধু অভিবাসীদের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই একটি উন্নততর পথ। 

চিরপ্রান্তিক কানাডিয়ানের নিঃশব্দ প্রশ্নাবলি

নীরব রাতে জেগে ওঠে,
ভাষাহীন প্রশ্নের ঢেউ—
আমি কি আসতাম এখানে,
যদি জানতাম ইতিহাসের রক্তাক্ত রেখা?

শ্বেতপত্রে লেখা ছিল না
ঔপনিবেশিক ছায়া, বৈষম্যের ছুরি,
তবু আমি এসেছি—
স্বপ্নের ভারে, আশার আলোয়।

কিন্তু আজ, দুই দশক পরে,
আমি দাঁড়িয়ে আছি দ্বিধার দোরগোড়ায়—
পরিচয় কি কেবল এক টুকরো কাগজে লেখা নাম?
অন্তর্ভুক্তি কি শুধুই নীতির শুষ্ক ভাষা?

আমি কানাডিয়ান, তবু প্রান্তিক,
এক চিরন্তন প্রশ্নের উত্তরহীন যাত্রী।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x