শিবাজীপ্রতিম বসু
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
সোজা ভাবে বুঝলে, রাজনীতি আবর্তিত হওয়ার কথা ‘প্রকৃত বাস্তবে’র চারপাশে। শুরুও হয় সেভাবে, কিন্তু অচিরেই এই ‘বাস্তব’টাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। বড় হয়ে উঠতে থাকে ‘বাস্তব’ নয়, কীভাবে সেই প্রকৃত বাস্তবকে দেখা হচ্ছে, অর্থাৎ মানুষজন কোন দৃষ্টিতে একটা বাস্তব ঘটনা দেখছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি, ইংরেজিতে বললে ‘পারসেপশান’ – সেটাই রাজনীতির মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষিতে আজ এটাই হয়ে চলেছে।
একটা গোদা উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, একটা ব্রিজ ভেঙে পড়েছে, প্রচুর লোক হতাহত। নির্মাণের সমস্যা থেকেই এমন বিপত্তি। বিশেষজ্ঞদের রিপোর্টে সেটা স্পষ্ট। ধরে নেওয়া যাক, এটাই ‘প্রকৃত বাস্তব’, যা নিয়ে স্বাভাবিক কারণে (গণতান্ত্রিক দেশে) বিরোধীরা শাসক পক্ষের বা সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইবে, এর বিরুদ্ধে ছোট-বড় প্রতিবাদ/আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে, শাসকরা যতটা সম্ভব এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা জনগণের কাছে মার্জনা চাইতে পারে এবং নানা তদন্তের শেষে ‘দোষী’-দের চিহ্নিত তথা শাস্তি বিধান করে, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। এইসব ঘটনা – দুর্ঘটনা, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তার জবাবদিহি, তদন্ত, বিচার প্রভৃতি নানা গণমাধ্যম যতদূর সম্ভব বস্তুগত (অবজেক্টিভ) ও নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরবে এবং জনগণ ভবিষ্যতে ভোট দেওয়ার সময়ে বিরোধী ও শাসকের বক্তব্য শুনে ও কাজকর্ম (আন্দোলন/তদন্ত) প্রত্যক্ষ করে, সব দিক খতিয়ে, নিজের মতো বিচার করে মতদান করবে, যা এর পরের সরকার গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে, আবার নাও করতে পারে।
ওপরের এই উদাহরণ আসলে পশ্চিমী দুনিয়ার একটা আদর্শ ও যৌক্তিক (র্যাশানাল) উদার গণতন্ত্রের আখ্যান। এমন ভাবেই উদারনৈতিক সমাজ – সরকার, বিরোধী তথা নাগরিকদের চলা উচিত – তা অ্যাডাম স্মিথ, জেরেমি বেন্থাম থেকে জন স্টুয়ার্ট মিল, টমাস পেইন থেকে টমাস জেফারসন – সকলেরই অভিমত। এমনকি, আমাদের সময়কার জার্মান সমাজতাত্ত্বিক তথা ফ্র্যাঙ্কফুর্টের ‘ক্রিটিক্যাল স্কুলের’ প্রবীণ সদস্য – য়ুরগেন হাবেরমাস অব্দি এখনও মনে করেন, গণতন্ত্র সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজন নাগরিক সমাজের একটি খোলামেলা ও সরকারের কাজকর্মের ভালমন্দ নিয়ে মতামত বিনিময়ের একটি মুক্ত ‘জন পরিসর’।
কিন্তু বাস্তবে কী হয়? তৃতীয় বিশ্ব বা দক্ষিন এশিয়ার কথা আপাতত তুলে রেখে বলি, এই ‘আদর্শ’ অবস্থা পশ্চিমী গণতন্ত্রেও কোথায়/কতদিন ছিল? ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ছেড়ে দিলেও (সেসব নিয়ে তো অনেক প্রখর সমালোচকের সঙ্গে এই পত্রিকার সম্পাদক মশাইও দীর্ঘদিন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছেন) প্রশ্ন – কবে, কোথায় ও কতদিন এই মুক্ত, সবার অংশগ্রণকারী উদার গণতান্ত্রিক ‘আদর্শ’ বজায় ছিল? তবুও দীর্ঘদিনের চর্চায়, পুরোটা না-হলেও, বেশ খানিকটা অবলেশ পশ্চিমী দুনিয়ায় এখনও কিছুটা থেকে গেলেও, দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলিতে, অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, কোথায় ছিল, বা থাকাটা আদৌ সম্ভব কিনা, সেসব প্রশ্ন থেকেই যায়।
ধরা যাক, ওই ব্রিজ ভাঙার বিষয়ে, দক্ষিণ গোলার্ধের অপশ্চিমী দেশগুলির বিরোধী দল প্রথম হৈচৈ করল, শাসক পক্ষ প্রথমে চুপ থাকল। তারপর তাদের কোনও মুখপাত্র প্রশ্ন তুলল, ব্রিজটা হয়তো তাদের আমলেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভেঙেছে, কিন্তু তার কন্ট্র্যাক্ট তো দেওয়া হয়েছিল তার আগের আমলে, যখন বর্তমান বিরোধীদের সরকার ছিল, তবে তারাই আজ ‘সাধু’ সাজে কীভাবে? এই নিয়ে প্রেস রিলিজ হল, বিরোধীরা রে-রে করে উঠল, সান্ধ্য টিভির ঘণ্টাখানেক তরজায় আকাশ-বাতাস মুখরিত হল। এটা কিছুদিন চলার পরে, নির্মাণের সমস্যা-জনিত কারণে ব্রিজ ভাঙার ‘প্রকৃত বাস্তবে’র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই বিষয়ে জনসাধারণের ‘পারসেপশান’ বা দেখার (ভিন্ন ভিন্ন) ভঙ্গি। তখন বেশ কিছু মানুষ তাদের প্রাক-নির্ধারিত রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী এই বাস্তবকে বিচার করবে। কিছু লোক বলবে, এর দায় বর্তমান সরকারের, কিছু জন প্রশ্ন তুলবে পূর্বতন সরকারের যোগসাজশের; অনেকে কোনও পক্ষ না নিয়ে একটি (গণতন্ত্রের পক্ষে হতাশাজনক) সিদ্ধান্তে পৌঁছবে – ‘যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ!’
দেখার এই পরস্পরবিরোধী অথবা/এবং ভিন্নতার ফলে জনসমাজ ক্রমশ তার যৌক্তিক বিচারের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তখন প্রধানত কিছু পরিমাণ বাস্তব তথ্যের সঙ্গে বহুলাংশে ‘পারসেপশান’ই মানুষের শুধু চিন্তাভাবনা নয়, তার সামাজিক আন্দোলনকেও প্রভাবিত করতে পারে। এক বছর আগে যে অতি-নৃশংস, ঘৃণ্য, বর্বরোচিত তথা সর্বজন ধিক্কৃত খুন-ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল কলকাতার আর.জি.কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে – তারপর প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা ও দলমত নির্বিশেষে ন্যায় বিচার বা ‘জাস্টিসের’ দাবিতে যে নাগরিক প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল সাধারণ মানুষ – তাতে, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, কিছুদিন পরে চিড় ধরল, এই ‘পারসেপশান’কে কেন্দ্র করেই। সবাই তখন ‘জাস্টিস’ চাইছে। কিন্তু ‘জাস্টিস’ কে দেবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের ছাত্রদের এই প্রশ্ন করায়, তাদের একজন উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘আমরাই স্যার’। ‘কিন্তু আমরাই তো জাস্টিস চাইছি, আমরা নিজেদের কীভাবে জাস্টিস দেব’? তখন একজন বলল, ‘সুপ্রিম কোর্ট দেবে’। ‘কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তো দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত – নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল উঠতে উঠতে সুপ্রিম কোর্টে যাবে। এই মামলাটা আসলে চলছে কোথায়?’ ছাত্ররা চুপ করে গেল। তখন তাদের জানালাম, ‘দেখো ন্যায় বা জাস্টিস তো অনেক বড় ধারণা। তার দুটো ভাগ – একটা সমাজের সমস্ত স্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে, যা সময়সাপেক্ষ – দীর্ঘদিনের সংগ্রামের বিষয়; আরেকটা হল, আইনি ন্যায়ের লড়াই – যার বিচার এই মুহূর্তে চলছে শিয়ালদহের ফৌজদারি আদালতে। অপরাধী এক হোক বা একাধিক, তার/তাদের বিচার করে ‘অভয়া’কে আইনি ন্যায়বিচার দেওয়ার প্রাথমিক ভাবে অধিকারী, ওই আদালতের বিচারপতিই’।
*****
পারসেপশান বা ‘দেখা’ও কিন্তু ‘মাধ্যম’ নির্ভর – সরাসরি গড়ে ওঠে না। বেশির ভাগ ‘বাস্তব’ই আমরা নিজে প্রত্যক্ষ করিনি, কারও বা কোনও সূত্রেই জেনেছি। সেটা প্রাক-আধুনিক যুগের ‘গুজব’ হোক, বা আজকের সংবাদপত্র, রেডিও-টিভি বা হালফিলের নানা দূরসঞ্চারী তথা ডিজিটাল কারিগরি নির্ভর সমাজমাধ্যম। মাধ্যম কথাটা ইংরেজির ‘মিডিয়াম’-এর বাংলা, ইংরেজি বহুবচনে ‘মিডিয়া’। মিডিয়াম হল তা – যা ‘মিডিয়েট’ বা মধ্যস্থতা করে। অর্থাৎ, কোনও বাস্তব ঘটনা – সাধারণ পাঠক/দর্শক বা গ্রহীতার কাছে ‘সংবাদ’ হিসেবে পৌঁছয় এই মিডিয়া (নিউজ বা মাস মিডিয়ার) মধ্যস্থতাতেই। সূর্য থেকে বিকিরিত পৃথিবীতে আসা আলোর মতোই দেখতে ‘সাদা’ দেখতে হলেও, আতস কাচ ধরলে, তা সাতটি রঙের বর্ণালিতে ভেঙে যায়, তখন বোঝা যায়, ওই ‘সাদা’ আলোর মধ্যেও আসলে অনেক রং আছে।
সংবাদ মাধ্যমের ক্ষেত্রেও তা-ই। সবাই ‘খবর’ পৌঁছচ্ছে, কিন্তু তাতে লেগে থাকছে নানা সংবাদ মাধ্যমের ‘নানা’ রং। এটা কোনও সময়েই সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব নয়। এমনকি, যাদের আমরা ‘বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ’ ভাবি, তাদের খবরেরও পরিবেশিত ভাষ্য (কন্টেন্ট/ডিসকোর্স) বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তারা কোন খবরের ওপর জোর দিচ্ছে, কাকে অবহেলা করছে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেশি মালিকানার খবরের কাগজগুলি (যেমন, অমৃতবাজার, যুগান্তর, আনন্দবাজার প্রভৃতি) বিভিন্ন আন্দোলন বা নেতৃত্বকে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছে, উল্টোদিকে ইংলিশম্যান বা স্টেটসম্যান তার প্রতি দেখিয়েছে ততটাই অবহেলা, অনেকসময়ই বিরোধিতা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রই – পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ (কমিউনিজম), এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেলে – যা কেবল আর্থ-রাজনৈতিক বা সামরিক যুযুধান শিবিরই নয়, মতাদর্শগত বিরোধী শিবিরও বটে – তার সরাসরি ছাপ পড়ল সংবাদমাধ্যমে। সংবাদমাধ্যম অনেকাংশে হয়ে উঠতে থাকে রাষ্ট্রের মতাদর্শগত প্রচারের হাতিয়ার। পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম ব্যাপারটা অনেক সূক্ষ্ম ভাবে করেছে, সমাজবাদী শিবির অনেক প্রত্যক্ষ ও স্থূল ভাবে – কিন্তু শেষ বিচারে উভয়েই করেছে। সরাসরি মতাদর্শগত প্রচার শুরু হয়েছিল অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ আগেই। একদিকে নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী সরকারের যুদ্ধবাজ একনায়কতন্ত্রের প্রচারযন্ত্র, অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়ার পাল্টা প্রচার ব্যবস্থা। এই দু’য়ের চাপে পশ্চিমি লিবারেল সংবাদমধ্যমের অবস্থা বেশ করুণই ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই চোখের পর্দা প্রায় ঘুচে গেল। সোভিয়েত দেশ ও তার নেতৃত্বে থাকা দেশগুলি (১৯৯০ অব্দি) সরাসরি সমাজবাদী ব্যবস্থার পক্ষে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিমের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশগুলির বিরুদ্ধে যেমন প্রচার চালিয়েছে, পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমও আগেকার ‘বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তির আবরণের ভিতরেই কখনও সূক্ষ্ম কখনও স্থূলভাবে কমিউনিজমের বিরোধিতা ও পুঁজিবাদের জয়গান গাইতে লাগল। ১৯৯০-এর শুরুতে সমাজবাদী শিবিরের পতন ও পুঁজিবাদের ‘বিজয়’ ঘোষিত হলে, দূরসঞ্চারী তথা ডিজিটাল কারিগরি নির্ভর তথাকথিত ‘নতুন (বিশ্বায়িত) বিশ্বব্যবস্থায়’, পশ্চিমী সংবাদমাধ্যম উদারবাদী (পুঁজিবাদী) গণতন্ত্রের নামে সরাসরি বহুজাতিক কর্পোরেটদের সমর্থক হয়ে দাঁড়াল। অনেকসময়, পুরোনো আমলের বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বর্ণিত মুদ্রণ-পুঁজি (‘প্রিন্ট ক্যাপিটালিজম’) নির্ভর সংবাদমাধ্যমের বদলে বহুজাতিক কর্পোরেটগুলি সরাসরি সংবাদমাধ্যমের মালিক হয়ে দাঁড়াল, বা পুরোনো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলির মালিকানার অনেকখানি কিনে নিল। ফলে, ‘স্বাধীন’ কণ্ঠস্বরের বদলে, অথচ ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’র উদারবাদী ‘আদর্শের’ আড়ালে, তারা ক্রমশ হয়ে উঠল মালিকগোষ্ঠীর আর্থরাজনৈতিক স্বার্থ নিরূপণের মাধ্যম।
এক দশকের মধ্যেই অবশ্য অন্য সমস্যা শুরু হল। বিশ্ব থেকে সোভিয়েত কমিউনিজমের ‘ভূত’ বা ‘স্পেক্টর’ (এটা মার্কসের কথা, পরে দেরিদাও বলেছেন) বিতাড়িত হলে, অন্য আর এক ‘দৈত্য’ জেগে উঠল – স্যামুয়েল হান্টিংটন কথিত আত্মপরিচয়-নির্ভর ‘সভ্যতার সংঘর্ষ’। যার মূল কথা, একদিকে বিশ্বের সব সভ্যতা, অন্যদিকে ইসলামী সভ্যতা। ১৯৯০-এর পর থেকে টুকরো টুকরো হওয়া সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের বহু দেশ তাদের ইসলামী পরিচয়ে ফিরে গেল, আর পূর্বতন দুই শিবিরের মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াইয়ে’র সময়, রাশিয়াকে ‘টাইট’ দিতে মার্কিন মদতে পুষ্ট হওয়া বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী (আফগানিস্তানের নানা গোষ্ঠী থেকে আল কায়দা অব্দি) সোভিয়েত পতনের পর আমেরিকা তথা পশ্চিমী দুনিয়ার শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়াল। ২০০১-এ ৯/১১-এ নিউ ইয়র্কে আল কায়দার হামলার পর জুনিয়র বুশ-এর ‘হয় তোমরা আমাদের সঙ্গে নয় আমাদের বিরোধে আছ’ বক্তব্য ফাটল আরও বাড়াল। সিরিয়ার সংকট ও শরণার্থী সমস্যা এই সংকট তীব্রতর করল।
এইসব কিছুর জেরে ১৯৯০ থেকে দশ বছর কিছুটা ‘মুক্ত দুনিয়া’র বাতাস ছড়িয়ে ‘বেচারা’ পশ্চিমী উদারবাদ ধীরে ধীরে আশ্রয় নিল ইসলাম ও ‘বহিরাগত’/পরিযায়ী বিরোধী আত্মপরিচয়ের রাজনীতির দক্ষিণ পন্থায়। গত শতকের দুই ও তিনের দশকে যেভাবে ইউরোপে ‘বিদেশি/ইহুদি’ বিরোধী একনায়কী ফ্যাসিবাদ গড়ে উঠেছিল, অনেকটা তারই মতো। কেবল আমেরিকা বা ইউরোপে নয় – দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতেও এই ধর্মীয় আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতি ও নেতৃত্ব চালকের আসনে বসল। বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজি ও তার প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ মালিকাধীন সংবাদমাধ্যমগুলিও এই দক্ষিণপন্থী পরিযায়ী/শরণার্থী বিরোধী ‘বিশুদ্ধ’ আত্মপরিচয়ের আখ্যান ফিরি করে সাধারণ গ্রহীতাদের পারসেপশান বা ‘দেখা’ নির্মাণ করতে লাগল যেখানে, জীবনানন্দের ভাষায় ‘কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়’।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে সমাজমাধ্যম এই ‘অপটিক্স’ আরও নিবিড়ভাবে গড়ে তোলে – সত্য-মিথ্যা বিচারের যুক্তি ও বোধাবোধ হারিয়ে মানুষ ক্রমশ হয়ে দাঁড়ায় হারবার্ট মারকুজের ভাষায় ‘একমাত্রিক মানুষ’ – যে এই উত্তর-সত্য যুগে তার খুঁটিয়ে বিচার করার বা ক্রিটিকাল সত্তা হারিয়ে হয়ে যায় শাসকের ভাষ্যে কেবল ‘হ্যাঁ-এ হ্যাঁ’ মেলানো বা সম্মতিজ্ঞাপনের পাত্র। নোয়াম চমস্কি থেকে হাবেরমাস অনেকদিন আগেই উদার গণতন্ত্রের জন পরিসরে বাণিজ্যিক সংবাদ মাধ্যম যেভাবে আমাদের ‘দেখা’ নির্মাণ করে সম্মতি আদায় করে, সে বিষয়ে সাবধান করেছিলেন।
‘দ্বিতীয় বৃত্তের’ মতো ছোট কিন্তু প্রভাবী পত্রিকা, যদি কিছুটাও পাঠকদের নিজেদের ‘যৌক্তিক সত্তা’ বাঁচিয়ে রাখার সহায়ক হয়, তবেই তা সার্থক হয়ে উঠবে।
সংক্ষিপ্ত গ্রন্থপঞ্জী
হারবার্ট মারকুজে (১৯৬৪), One-Dimensional Man: Studies in the Ideology of Advanced Industrial Society, Beacon Press, Pantheon Press
বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (১৯৮৩), Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Verso
এডওয়ার্ড হারম্যান ও নোয়াম চমস্কি (১৯৮৮), Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media
য়ুরগেন হাবেরমাস (১৯৮৯), The Structural Transformation of the Public Sphere: An Inquiry into a Category of Bourgeois Society, Polity Press
জাক দেরিদা (১৯৯৩), Specters of Marx: The State of the Debt, the Work of Mourning and the New International
স্যামুয়েল হান্টিংটন (১৯৯৬), The Clash of Civilizations and the Remaking of World Order, Simon & Schuster
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক এই প্রবন্ধ। আজকের এই মিডিয়া মগজধোলাইয়ের দিনে মানুষকে সচেতন করে দেওয়া আমাদের সকলের কর্তব্য। লেখককে ধন্যবাদ এই কাজটি দ্বিতীয় বৃত্তের মতো নতুন অনলাইন প্রকাশনায় করার জন্য। আমরা শিবাজীপ্রতিম বসুর আরো লেখা চাইবো।
খুব ভালো লেখা, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম।