Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

হাওরে বৈশাখ স্মৃতি

ইশতিয়াক রুপু 

যতই নামুক কাল বৈশাখী

থাকবে রোদের খেলা

ঠিক আমাদের টেনে নিলো বোশেখের

 মেলা।

বৈশাখ আমাদের সার্বজনীন উৎসব।হাওর পাড়ে বৈশাখ, স্বপ্নে বুনা বাকী সময় সুখে কাটানোর সবাক চিত্র।বাঙালী সমাজে বৈশাখ উৎসব পালনের ইতিহাস হাজার বছরের।উৎসব পালনের রীতি কিম্বা রকমের চিত্র এক হলেও হাওরের পাড়ে চিত্র কিছুটা ভিন্ন।একমাত্র ফসল বোরো ধান রোপিত হয় শীতের শেষে পৌষ মাসে।ফসলের পূর্ণতা আসে চৈত্রের মাঝামাঝি।হাওর পাড় জুড়ে ফসল তোলার সাজ সাজ রব। প্রস্তুতি চলে বাড়ীর ভিতর ও বাহিরে।শহুরে বৈশাখ উৎসবের সৌখিন পান্তা ভাত আর ভর্তা। 

হাওর পাড়ে চিত্র আলাদা।ভোরের আলো ফুটে উঠার পূর্বেই শুরু হয় পরিবার ও প্রতিবেশীদের হাঁক ডাকে জড়ো হয়ে মুড়ি খই দিয়ে নাস্তার পর্ব।স্ব স্ব ধর্মের অনুশাসন মেনে সৃস্টি কর্তার প্রতি সন্তোষ্টির উপাসনা।তা গ্রামের মসজিদে নয়তো অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপসানলয়ে।গৃহকর্তার কপালে চিন্তা বলিরেখা।সারা বৎসর ব্যাপী সদাই পাতির চুড়ান্ত হিসেব নিকেশ ৩০শে চৈত্র।

মজুদ ধানের শেষ চালান বিক্রীর নগদ টাকা হাতে আছে।সেখানে হাত দিতে হবে।ফসল তোলার খরছের জন্য রাখা জমানো পূজিতে।সেই সময় আসুক।দেখা যাবে তখন।ঐ যে বলে না। যখন যেমন তখন তেমন,সময় বুঝে কাজ।কানে আসে সন্তানদের বৈশাখী উৎসব নিয়ে নানা স্বপ্ন।বড় মনোহারী দোকান শশী বাবুর গদি ঘরে মিষ্টি খাওয়া। সবাই বলাবলি করে ঐ দোকানের মিষ্টি মন্ডা সব আসে শহরের নামি মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে।তাই বোধকরি মন্ডা মিঠাই এর স্বাদ  অপূর্ব।পরে আরো দুচার খানা গদি ঘরে বাবার সাথে থেকে মিষ্টির স্বাদ নেয়া।বেলা পড়ে গেলে রওয়ানা বাজারের উত্তর মাথায়।সবুজ পাতার ছাতা নিয়ে দাড়ানো শতবর্ষী বট গাছের নীচে।ওখানে যে মেলা বসে! পাতার বাঁশী, কটকটি বাজনা, মাটির পুতুল সহ আরো কতকিছু।সঙ্গে  বাঁশের তৈরী ছোট ছোট লাঠির মাথায় লাগানো নানা জাতের মুখোশ।দু আনা করে এক একটি।কে কোনটি নেবে তা নিয়ে চলছে তমুল যুদ্ধ। 

বাড়ী ফিরতে  দু এক কেজি গুড়ের তৈরী জিলাপি নিতেই হবে ঘরে আনবার জন্য।চৈত্রের শেষে বৈশাখী ফসল কাটা।নদীর পাশে পলি মাঠির চরের জমিতে ফলে আগাম জাতের বোরো ফসল।কালচে রঙের মোটা চালের ধান। চৈত্রের আকালে যেন বন্ধু বেশে ঘরে এল।ঘরে বাইরে কামলা কামিন সবাই ব্যস্ত।আছরা নয়ত বাগধার জাতের আগাম বোরো ফসল তুলে এনে করতে হয় মোটা মোটা লাল চালের সংস্থান। মাড়াই ঝাড়াই করে বৈশাখের ফসল তোলার এ মহাযজ্ঞে কে কত দামি তা শুধু হাওরের পাড়ের গৃহস্থ পত্নীই জানেন।তারপর ও দিন গুনে রাখেন কবে আসবে পয়লা বৈশাখ।ব্যস্ততার মাঝেও এই উৎসবের দিনে রাখেন বাড়তি আনন্দ যোগে ভালমন্দ নানা পদের সন্দেশ পিঠে।হাওরের পাড়ের  মা চাচীদের আদর সম্ভাসনের স্মৃতি আজো উজ্জ্বল ।

ফসল তোলবার সময় সখ করে বাড়ী যেতাম।সবার ব্যস্ততা ও কামলা কামিন দের ছোটাছুটি হৈ চৈ ছিল দারুন উপভোগ্য।

গ্রামের এক প্রান্তে চলত সদ্য কাটা ধান মাড়াই। খড় আলাদা করে বড় বড় বস্তায় ধান তোলা হত গরুর গাড়ীতে।সেই গাড়ী চালিয়ে নিয়ে আসাটাই ছিল মূল আকর্ষন।সরু সরু আলপথ নয়ত গ্রামের প্রান্তর বেয়ে। হুট হাট বলে।গরু কে  তাড়ায়ে নয় দাবিয়ে। ধান ভর্তি গাড়ী চালানোর নিটোল আনন্দ আজো স্মৃতিতে জ্বল জ্বল করছে।বাড়ীর সামনে ছিল ধান শুকানোর বিশেষ খোলা জায়াগা।ঘাস বিচালি পরিস্কার করে।গোবর মাঠি দিয়ে লেপে রাখা হত।সেখানেই চলত ধান শুকানো। উঁচু ঢিবির মত করে ধান সংরক্ষন।আঞ্চলিক ভাষায় নাম * খলা*।সেই খলাতে ফেরী করত মিষ্টিওয়ালা,লেইস ফিতা চুড়ি বিক্রেতারা।টাকা পয়সা দিয়ে নয়।চাচী ও বোনরা ধান দিয়ে কিনে নিতেন কিছু সৌখিন সামগ্রী আর সখের মিঠাই জিলাপি।বৈশাখ মাসের  প্রথম দিনের পুরোটা ছিল উৎসবের আদলে।প্রাণের উৎসবে।পরিবার পরিজন স্বজন প্রতিবেশীদের নিয়ে মিলন মেলায় সম্পৃতির মহা আনন্দের দিন।

খাবারে ছিল বৈচিত্রের সমাহার।থাকতো বিশেষ ধরনের পিঠা পুলির আয়োজন।ভোরের প্রাতরাশে ঘরে ভাজা মুড়ি খই এর সাথে  খাঁটি দুধের,ঘরে পাতা দই।সাদা ধব ধরে  পোক্ত  নারিকেল কোরা ও সুমিষ্ট চাঁপা কলার বিরাট আয়োজন।অন্যটি  জালী পিঠা দিয়ে বিন্নী চালের ক্ষীর খাওয়া। বোরো ধানের চারার জন্য রাখা শাইল জাতের ধান হতে তৈরী হত জালী পিঠা।চালের গুঁড়াকে কলাপাতায় মুড়ে চুলার মধ্যে পুড়ানো হত। কেউ কেউ আবার পানির ভাঁপে রেখে বানানো।দারুন সুস্বাদু  সেই পিঠা গুলি। পোড়া কলা পাতা পেচিয়ে পেচিয়ে খুলতে হত।সঙ্গে সঙ্গে নাকে এসে লাগত শাইল ধানের মাতাল করা বুনো ঘ্রাণ।পিঠা ভেঙ্গে ভেঙ্গে খাও মরচা গুড়ের তৈরী মজাদার বিন্নী চালের ক্ষীর দিয়ে।বিকেলে দল বেঁধে গঞ্জের মেলায় চলতো ষাড়ের লড়াই।একই সাথে চলতো হাডুডু ও কুস্তির বিশেষ আয়োজন।আশে পাশের গ্রাম ভেঙ্গে আসা লোক জনে মেলা হয় যেত জমজমাট। চলত নানা সওদা পাতি।গৃহস্থালী সামগ্রী হতে শুরু করে কিশোরীদের মুখে ঠোঁটে মাখার জন্য পাউডার লিপস্টিক সবই বিক্রী হয় দেদারসে। আনন্দ উল্লাস চারপাশে।উৎসবের রেশ যেন সবাই কে রাখে মিলনের আমেজে।চিরায়ত বাঙলার সার্বজনীন এই উৎসব আজো আছে  ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার।আমাদের দেশ, আমাদের গর্বের জায়গা, আমাদের ঐতিহ্য।এই উৎসবের দিনে যুক্ত হতে চাই ভালোবাসার আহব্বানে।তাই তো গেয়ে উঠি,

এসো হে বৈশাখ,এসো এসো 

তাপস নিঃশ্বাস বায়

মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে

বৎসরের আবর্জনা

দূর হয়ে যাক যাক যাক

এসো এসো…

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x