Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

আমার শৈশবের ঈদের দিনগুলি

কাজী রাফি

আমার শৈশবের ঈদের দিনগুলো শুধু ঈদের কারণে আনন্দময় ছিল না বরং এই দিনে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে থাকা অভূতপূর্ব এক শান্ততার দৃশ্যকল্প আমার শিশুমননে অনন্য প্রভাব বিস্তার করেছিল। ‘বাইরে মাঠে-ঘাটে, গঞ্জে, বাজার এলাকায় কোথাও কেউ নেই’। ‘থমকে গেছে যেন মানুষের কোলাহল আর ব্যস্ততা’ – ঈদের দিনে এমন সব বাক্যই মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতো । আমাদের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে বাগান-পুকুর এসবের পরেই ছিল দিগন্তহীন এক মাঠ। যে মাঠের শেষ সীমানায় ছিল মাঠের সাথেই মিলিয়ে যাওয়া এক আসমান। মাথার উপরের আকাশটা দিগন্তের সীমারেখায় যেন ‘আসমান’ নাম ধারণ করে অসীম এক জগতের দিকে ইঙ্গিত করে থাকত। বলা যায় এই বিরাট দিগন্ত আমার শিশুমনে ফেলে রেখেছিল অনন্ত অসীম-ভাবনার খোরাক। একটা শিশু যেমন বাতাসের ভিতরে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির কোনো দৃশ্য দেখে অবাক তাকিয়ে থাকে – আমি তেমনি করেই এই মাঠটার দিকে অবাক বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে থাকতাম। বলা বাহুল্য ঈদের দিনে মাঠটি নিয়ে আমার অবাক হওয়ার পালা লম্বা ছিল। 

দূরে ছবির মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটা পাকুড় গাছ আর কিছুটা কাছে দীঘিরপাড়ের জঙ্গলের পাশে সবুজ ঘাসের এক টুকরা চত্বর ছিল আমার ভাবনার বড় কারণ। মনে প্রশ্ন জাগত, খাঁ খাঁ প্রান্তরে মাত্র এই কয়েকটা গাছগুলোর রাতে ভয় লাগে না!  উত্তরও পেতাম। বুঝতাম, দিগন্তে ছবির মতো দাঁড়িয়ে একটা দীঘি, একটা বন, কয়েকটামাত্র গাছ আর এই দিগন্ত ওরা একে অন্যের বন্ধু। হ্যাঁ, এই অনন্য, উদার বিশাল প্রান্তর আমার মননে সেই শৈশবেই ফেলেছিল ঐন্দ্রজালিক এক বিস্ময়। যে বিস্ময় নিয়েই আজো আমি জগতের দিকে, পাহাড়-প্রকৃতি, আসমান-জমিন, নদী-সাগরের দিয়ে তাকিয়ে সৃষ্টির রহস্য-ভাবনায় আপ্লুত হই।   

আমার শৈশবে ঈদের দিনে আমি ঠিক শূন্য তেপান্তর আর নির্জন প্রান্তরটা দেখার জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠে পুকুরপাড় পেরিয়ে মাঠটার মুখ থেকে ঘুরে আসতাম। কেন যেন মানুষশূন্য একা একা মাঠটা দেখাতে খুব ইচ্ছা করত। মনে হতো আজ মানুষমুক্ত এই মাঠটা বাতাসের সাথে, মেঘের সাথে অথবা রোদের সাথে, মেঘলা দিন হলে তার আধো আলো আধো আঁধারের সাথে মনের কথা বলাবলিতে ব্যস্ত। দারুন আনন্দে তারা একে অন্যের সাথে হুল্লোড়ে মেতে আছে। যে প্রাণচাঞ্চল্য চোখে দেখা যায় না শুধু অনুভব করা যায় – ঈদের দিনে সকলের অদেখা সেই প্রাণচাঞ্চল্যটুকু দেখাটুকুই ছিল আমার ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। সত্যিই আমি ঈদের দিনের এই একটা দৃশ্যকল্প য়াজো বুকে ধারণ করে আছি।

ঘুম থেকে উঠে সূর্যের প্রথম আলোকরশ্মির সাথে প্রতিযোগিতা করে গোসল সেরে বাবার হাত ধরে ঈদগাহে মাঠে যাওয়ার তুমুল আনন্দে মুখরিত আমাদের সেইসব শৈশবের ঈদের দিন! এখনো কত স্পষ্ট আর জীবন্ত হয়ে আমার মানসপটে ভাসতেই থাকে। ঈদগাহে যাবার পূর্বে মা নতুন জামা পরিয়ে দিতেন। আমার একমাত্র বোন বয়সে আমার চেয়ে ছোট হলেও আমার চোখে কাজল পরিয়ে দিতে গিয়ে প্রথম প্রথম চোখ দিয়ে জল ঝরিয়ে অতঃপর তার কাজল পরানোর হাত পাকা করেছিল।  

আমার প্রথম ঈদের দিন স্মরণ করতে গিয়ে মনে পড়ছে, টিপটিপ বৃষ্টির এক দিন। বাবার ছাতার নিচে তার হাত ধরে ঈদগাহ মাঠের দিকে যাচ্ছি। কাচা তাই বৃষ্টিতে ভেজা পথ সন্তর্পণে চলতে চলতে বাবা পুকুড় পাড়ের উঁচু এক টিলামতো স্থানের জামগাছ  দেখিয়ে বলছেন,

​আব্বু, নামাজ শেষ করে আমি বের না হওয়া পর্যন্ত তুমি এখানে বাচ্চাদের সাথে খেলো। ঈদগাহে একটামাত্র বের হওয়ার পথ তো…

​বাবা ঈদগাহে ঢোকার পর অন্যান্য গ্রামের অসংখ্য অচেনা বাচ্চার সাথে সেই প্রথম আমার পারস্পারিক অভিযোজনে অভিযোজিত হওয়া। সেই প্রাচীন জামগাছ আর টিলামতো উঁচু এক ভূমির প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে গিয়ে খেলার আনন্দে মেতে উঠার আনন্দ-স্মৃতি আমার নতুনতর জীবনে বেড়ে এবং বড় হয়ে উঠার পথে প্রেরণা হয়ে থেকেছে।

আমাদের ঈদগাহ মাঠটা ছিল কয়েকটা গ্রামের সংযোগস্থলে আশেপাশের সকল স্থান থেকে একটু উঁচুতে যার পশ্চিমে ছিল দিগন্তছোয়া এক মাঠ। পূর্বে ছিল কয়েক একরে বিস্তৃত এক পুকুর। ঈদগাহে মাঠে বাবার পাশে বসে, ইমামের বয়ান শোনার চেয়ে অদ্ভুতভাবে আমার মন, একেবারে নির্জন হয়ে যাওয়া বিস্তৃত মাঠ আর ওপরের নীল আকাশে সাদা সাদা ছোপ ছোপ মেঘ দেখে কল্পনাবিলাসী হয়ে উঠত। ইমামের বলা ‘কারবালার মাঠ’, ‘পিতা কর্তৃক পুত্রকে কোরবানী’র দৃশ্যপট, অথবা জলের জন্য এক মায়ের মরিচিকার পানে হাহাকার ছুটে চলা – এইসব গল্পের ঘটনাপুঞ্জকে ঈদগাহর সামনের নির্জন আর বিস্তৃত সেই মাঠে কল্পনায় সাজিয়ে নিতাম। বলা যায়, নীল আকাশের নিচে, গ্রামের পশ্চিমের সেই ঈদগাহের মাঠ আর দিগন্তছোয়া নিসঃঙ্গ প্রান্তরে রোদ অথবা মেঘের সাথে বাতাসের হুটোপুটি খেলার জগতটাই ছিল আমার শৈশব-কল্পনার সূতিকাগারের ছোট্ট এক অংশ। এখনো যখন মাঠটা স্মৃতিলোকে ভেসে ওঠে, মনে হয় – আরবের ঘটে যাওয়া সব ঘটনা আমি মাঠের মাঝেই কল্পনা করি। আরব দেশটার ঈদ সংক্রান্ত যত গল্প, নবীজীর জীবনের সব ঘটনা যে এই মাঠের ভিতরই কোথাও ঘটে গেছে। একটা শিশুর দেখা ছোট এক পৃথিবীই ছিল তার পুরো কল্পনার জগত!

আমাদের শৈশবে বিশেষত ঈদুল-ফিতর-এর ঈদে বিভিন্ন খেলাধুলা নিয়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ঈদগাহ মাঠ থেকে আসার পর দ্বিতীয় দফায় অপেক্ষাকৃত ঝাল(পোলাও-মাংস) খাবার খেয়ে সেই প্রতিযোগিতা দেখতে যেতাম। কিন্তু ঈদুল আযহার ঈদের দিনটা আমার কাছে সেই শৈশব থেকেই বেদনা বিধূর বলেই মনে হতো। কোরবানির জন্য কেনা গরুটার জন্য বড্ড মায়া হতো। ঈদগাহ থেকে আসার পর সবাই যখন তাদের গরু অথবা ছাগল নিয়ে কোরবানী করার জন্য আমাদের বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে জড়ো হতো, তখন ঘরে গিয়ে চুপ করে দুই কান বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম। এতগুলো প্রাণীর রক্ত যেন না দেখতে হয় তার জন্য আমি রক্তগুলো ধুয়ে না ফেলা পর্যন্ত বাইরে বের হতাম না।  

আমাদের গ্রামে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র ছিলেন বলে বাবা কোরবানীর জন্য বড় আর হৃষ্টপুষ্ট দুই গরু বাছাই করতেন যেন বাবার মৌজার সবাই, বিশেষত দরিদ্র মানুষগুলো পর্যাপ্ত মাংস পেতে পারেন। হৃষ্টপুষ্ট প্রাণিগুলো যাদের সাথে কিছুদিনের মধ্যেই আমার সখ্যতা গড়ে উঠত তারা স্রেফ মানুষের খাদ্য উপযোগি মাংসে পরিণত হওয়ার পর আমাকে বাইরে আসতে হতো। দেখতাম বাবা সেখান থেকেই তিনভাগ করা মাংসের এক ভাগ গ্রামবাসী, এক ভাগ প্রতিবেশি আর আত্মীয়-স্বজনকে দেয়ার পর নিজেদের ভাগ থেকে মসজিদের ইমাম আর মুয়াজ্জিনকে মাংস বিতরণ শেষে তবেই অবশিষ্ট মাংস বাসায় পাঠাচ্ছেন।

সেই গরু আর খাসি কোথাও নেই দেখে চারপাশে আমি প্রাণিগুলোর রেখে যাওয়া স্মৃতির মাঝে তাদের প্রাণ খুঁজে ফিরতাম। মা আমাকে সেই দিনগুলোতে যা বোঝাতেন তার মর্মার্থ ছিল,

স্রষ্টা মানুষকে ‘ত্যাগের মহাত্ম্য’ শেখাতেই প্রাণ উৎসর্গের এই প্রথা রেখেছেন। মানুষকে তিনি মনে করিয়ে দিতে চান যে, ত্যাগটাই কঠিন বলে জীবনের পথে ভোগের চেয়ে ত্যাগেরই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। আজ মন খারাপ করে থাকলে মহান আল্লাহতায়ালা অসন্তষ্ট হবেন,বাবা।

আমার শিশুমন এসব কথা মানতে চাইত না। সুতরাং পরিশেষে আমার মন ভালো করার জন্য বিকেলে বাবা কখনো কখনো নিজে আবার কখনো কখনো গৃহপরিচারক আবুল চাচা আমাকে দিগন্তছোয়া ফাঁকা মাঠটায় নিয়ে যেতেন। সূর্যের নিস্তেজ রক্তিমাভা আলো তখন ছড়িয়ে আছে নিসঃঙ্গ মাঠ আর অসীম আকাশে। 

সেই মাঠে গিয়ে আমার কেন যেন মনে হতো, মাংসে পরিণত হওয়া প্রাণগুলো মিশে আছে রোদের এই নিস্তেজ আলোর মাঝে। রাত নেমে এলেই তারা আকাশের তারা হয়ে যাবে। বিকেলের এই নির্জন শূন্য মাঠ আমাকে ভাষাহীন করে দিত। আমি চুপ হয়ে যেতাম। আর আমার শিশুমনের অনুভবটুকু কেউ বুঝতে না পেরে ভাবত, কোরবানী হয়ে যাওয়া গরু অথবা খাসিটার কথা আমি ভুলে গিয়েছি। 

তারা কখনোই বুঝতে পারত না যে, গরুটার চোখের নিচে অশ্রু জমে জমে কালো হয়ে ওঠা অংশের দৃশ্যটুকু আকুল বেদনার স্রোত হয়ে আমার মনের মধ্যে প্রবাহিত হতে হতে আমাকে অবশ করে ফেলেছে। 

ঈদ-উৎসব আমার মনে ফেলে রেখেছে অনন্য সব দৃশ্যকল্প –মানুষে মানুষে প্রাণের বন্ধনের, উত্তাপের, একাত্মতার অমূল্য সব স্মৃতি। শহরের জীবনে আমাদের সন্তানরা তার সন্ধান পায় না, হয়তো।  

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x