Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

এ ক টি   নী ল   খা ম

বিদ্যুৎ সরকার, টরন্টো  

কিছুদিন আগে পাওয়া মা’র চিঠি আমাকে কিছুটা বিচলিত করে দিল। পূজোর ছুটিতে এবার কোলকাতায় যেতে বলেছে। বাবার নির্দেশ কোনভাবে বুঝিয়ে – সুঝিয়ে পার পেলেও মা’র বেলায় তা কোনভাবেই সম্ভব হয় না। আর সে এটাও জানে এ সময়টাতে আমার কাজের চাপ অনেকটাই কম থাকে।  দুর্গা পূজা উপলক্ষে লম্বা ছুটি। খুলবে একেবারে শ্যামা পূজার পর। প্রাইভেট জবের এটাই প্লাস পয়েন্ট। এ ছাড়া আমার সব কাজ ছুটির আগেই শেষ করে রাখি। কোন কাজ আর পেন্ডিং রাখতে আমি মোটেও সচ্ছন্দ বোধ করি না। গত দু-বছর অবশ্য কোলকাতায় যাওয়া হয়নি পূজোর ছুটিতে । সে দু’বছর বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম আন্দামান ও ব্যাংকক। তাই, এবারের মার নির্দেশের ভ্যালিড কারণও  রয়েছে। দু’দিনের মধ্যে অফিসকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে বারতি কয়েক দিন ছুটির আবেদন করে কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া হলো, আমি কলকাতা যাচ্ছি পূজো উপলক্ষে। কাল সকালেই টিকেট কেটে নিতে হবে। তা না হলে পূজোর সময়টায়াতে টিকেটের দাম অনেক চড়া থাকে।

 বিশেষ করে শ্যামা পূজা কম বেশি ইন্ডিয়ার সব প্রদেশে উদযাপিত হলেও দুর্গা পূজা শুধু পশ্চিম বঙ্গেই সীমাবদ্ধ। দূর্গা পূজাকে ঘিরে যে আলোকিত আলোড়ন সৃষ্টি হয় তা আর  কোন উৎসবে হয়ে থাকে বলে মনে হয় না। এর ব্যপ্তি তুলনাতীত। পূজায় উৎসবের  আমেজটাই মূখ্য হয়ে দেখা দেয়।এর নান্দনিক ও শৈল্পিক দিকটি প্রাধান্য পায় বেশি। প্রতি বছরই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্যুরিস্টরা ছুটে আসে পূজার আনন্দ উপভোগ করতে।এর কালচারেল মুভমেন্টটা বিশেষভাবে লক্ষনীয়। প্রতি বছরই মা দুর্গা আসে নতুন সাজে,বিভিন্ন রূপে।পূজা প্যান্ডেলগুলোর বিচিত্র সাজ-সজ্জা ও আলোক সম্পাতে মুন্সিয়ানার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চল অব্দি অর্থাৎ পশ্চিম বাংলার সর্বত্র একটা সাজ সাজ রব চলতে থাকে এই পূজোকে কেন্দ্র করে। আবাল,বৃদ্ধ, বনিতা সবার পরনে শোভা পায় নতুন নতুন জামা-কাপড় এবং নানান ধরনের সাজ-সজ্জার উপকরণ। খোদ কলকাতা সহ অন্যান্য শহরগুলো পরিনত হয় এক একটি ‘ ইকনোমিক হাব ‘- এ। বেশ কিছু দিন ধরেই চলে এ আনন্দ উৎসব।
২.
আমার ব্যক্তিগত লেটারবক্সে সাধারণত আমার অফিস ও অন্যান্য কিছু চিঠি আসে। কিন্তু, সোশ্যালাইজেশনের উদ্দেশ্যে আজকাল আর কেউ খাম বা পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখে না। মেসেঞ্জার অথবা ই-মেইল এখন একটি বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। তবে মা-বাবা এখনও এনভেলপেই আমাকে লিখে থাকেন। হঠাৎ সেদিন দেখি আমার লেটার বক্সে একটি নীল খাম এসে পড়ে আছে। তাতে আবার বিদেশের স্ট্যাম্প লাগানো। ঝটপট খুলে দেখি বন্ধু রূপার লেখা চিঠি। রূপা আমার বন্ধু। কৈশোর থেকে যৌবনের শেষ সিঁড়ি অব্দি আমরা দু’জনে একসাথে এক পথে পাশাপাশি  হেঁটে চলেছি।এর মধ্যে যেমন সুখ ছিল দুঃখও ছিল। প্রেম ছিল, ছিল অপ্রেম। স্পর্শের শিহরণ ছিল তেমনি ছিল দূরে চলে যাবার অভিমান। আবার ওর হাতে হাত রেখে ট্রাম লাইন দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে যেতাম গড়ের মাঠের অপর প্রান্তের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়েলের নন্দন কাননে। রূপা লেকের জলে পা ডুবিয়ে নেড়ে-চেড়ে জলে ঢেউ তুলতো। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম ওর শ্বেত-শুভ্র পদযুগল। হয়তো কলেজে উঠে একটু বেশিই পেকে যাই তখন। কাছে যাবার সাহস যুগিয়ে দিত সেইই। কলেজের পাঠ চুকিয়ে আমি চলে এলাম প্রেসিডেন্সিতে আর রূপা চলে গেল কোলকাতা ইউনিভার্সিটি। সাবজেক্টও ভিন্ন হয়ে গেল। ওর বিষয় ছিল ইকনোমিক্স আর আমার ফিনান্স। দেখা হতো প্রতি দিন না হোক কিন্তু প্রায়ই। কাছের রক্সি, লিবার্টি ছাড়া অন্য হলগুলোতে মাঝে মাঝে ইংলিশ মুভি দেখতাম দু’জনে। যৌবনের অনেক না ভুলা অনেক স্মৃতি আমরা এখনো ধরে রেখেছি সযতনে। এখনো দেখা হলে আবার আমরা দু’জনে ডুবে যাই অতীতের দিনগুলোতে। স্মৃতিগুলোই আমাদের ওখানে টেনে নিয়ে যায় সংগোপনে। আমরা আবার ভাললাগার বুদবুদে ভাসতে থাকি আনন্দে। এইই সেই রূপা যার চিঠি পেয়ে আমি মনের ভিতরে থাকা পুরনো স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তুললাম।
৩.
ওর পি এইস ডি ‘র প্রায় শেষ প্রান্তে। অক্সফোর্ডের সবার  প্রিয় না শুধু অতি প্রিয় একজন বাঙ্গালী  বিদুষী, সুন্দরী ললনা। সে এবার পূজায় আসছে কলকাতায়। তাই চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে আমি যেন অবশ্যই কলকাতায় থাকি এ সময়টাতে। গেলে অনেক মজা হবে। পুজোর দিনগুলোতে দিনভর দু’জনে কোলকাতা চষে বেড়াবো, বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় আমাদের প্রিয় খাবারগুলো খাব আর রাতের বেলায় ওদের ছাদে শুয়ে শুয়ে অনেক অনেক তারা দেখবো। রাতের বেলায় উড়ে যাওয়া শরতের সাদা মেঘ দেখবো।
সে-ই প্রথম আমাকে চুমু খাওয়ার স্বাদ এনে দিয়েছিল একদিন চাঁদ দেখার রাতে। সেদিন ওদের ছাদে আমরা শুয়ে শুয়ে গল্প করছিলাম আর আনমনে চাঁদের সৌন্দর্য  দেখছিলাম তখন সে বললো, তুই চোখবুজে থাক, তোকে ভারি সুন্দর একটি জিনিস দেখাবো।ওর কথামতো আমি চোখ বুজে ছিলাম। হঠাৎ আমার ঠোঁটে  ওর ভেজা ঠোঁট স্পর্শ করলো। আমি কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিলাম ক্রমশ। রূপার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে আমিও তাপিত হচ্ছিলাম। ওর শরীর থেকে ভেসে আসা একটি মিষ্টি গন্ধে আমিও ভসছিলাম যেন।
রূপা পূজায় কোলকাতায় আসছে।আমার  শৈশবের বন্ধু কৈশোরের বন্ধু, যে আমাকে প্রথম চুমু খাওয়ার স্বাদ পাইয়ে দিয়েছিল। আমি তো এমনিতেই যাচ্ছিলাম মায়ের ডাকে। রূপার সান্নিধ্য  আমার বাড়তি পাওয়া। আবার আমরা আনন্দে আত্মহারা হব, শিহরনের বুদবুদে ভেসে বেড়াব যখন তখন। রূপার নীল খাম আমার বুক পকেটে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ বুঝি অনুভব করছি এখন।  

____________________

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x