আজমল হুসেন
আমাদের অর্থাৎ বাঙালি জাতির অস্তি-মজ্জায়, রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে উৎসব। তাই অনেকেই আমাদেরকে পৃথিবীর সবচেয়ে উৎসবপ্রিয় জাতি বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। যে সকল বাংলাভাষী চিন্তায়, চেতনায়, ভাবনায়, আবেগে আর দৈনন্দিন কার্যকলাপে অসাম্প্রদায়িকতা, সহমর্মিতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, মানবতা, বন্ধুত্ব আর সর্বোপরি ভালবাসাকে নিজের জীবনের বীজমন্ত্র বলে জানেন এবং মানে্ন, আমি তাঁদেরকেই প্রকৃত অর্থে বাঙালি বলে মনে করি। আমি তাঁদেরকেও বাঙালি বলে স্বীকৃতি দিতে চাই যাঁরা বাইরে থেকে এসে এই বাংলাকে, বাঙালিকে এবং বাঙালিত্বের এই ভাবাবেগকে আপন করে নিয়েছেন। আমার এই বাঙালিত্বের ভাবাবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে এমন কিছু উৎসবের কথা আমি আজ এখানে বলতে চাই।
আমার প্রিয়তম উৎসবের অন্যতম হল আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তক মেলা, বইমেলা হিসেবেই যা অনেক বেশি খ্যাত। এর জন্য প্রতিবছর মূলত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধের শেষে শুরু হয় অপেক্ষা, যার অবসান ঘটে পরের বছর জানুয়ারি মাসের শেষে, ঠিক যখন আক্ষরিক অর্থে বইমেলা শুরু হয়। বইমেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই আয়োজনের তোড়জোড় আর দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়, যাতে জড়িয়ে আছেন প্রকাশক-লেখক-পাঠক-ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই। ছাপাখানারও অভাবনীয় ব্যস্ততা দেখা যায় তখন।
পাঠক সমাবেশের নিরিখে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বইমেলার স্থানটি দখল করে আছে কলকাতার এই বইমেলা। বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য কলকাতা বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম, তুলনাহীন।। প্রায় পাঁচ দশক ধরে বইপ্রেমী বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এই বইমেলা। প্রতিবারই প্রথম দিন থেকেই বইপ্রেমীদের ভিড় উপচে পড়ে। বইয়ের এই মহোৎসবে সামিল হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে বছরভর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন বইপ্রেমীরা ৷ মেলার শেষ সন্ধ্যায় বাঙালির প্রাণের এই উৎসব থেমে যায় । তারপর আবার শুরু হয় বছরভরের প্রতীক্ষা। কলকাতা বইমেলা চলাকালীনই কিছু প্রকাশক সীমান্তের ওপারে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি নিতে থাকেন অমর একুশে বইমেলায় যোগদান করতে। বাঙালির কাছে এই অমর একুশে বইমেলাও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই আবেগের। আজকাল সীমান্তের দু’দিকেই বাংলার এই বইমেলার ব্যাপ্তি কলকাতা-ঢাকা ছাড়িয়ে বিভিন্ন রাজ্যে, জেলায়-উপজেলায় ও শহরে পৌঁছে গেছে।
আরও অজস্র বাঙালির মতো আমার কাছেও বইমেলা বহু সমমনস্ক অগ্রজ-অনুজ-বন্ধুস্থানীয় লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী স্থান – এক পুণ্যতীর্থ।। সারা বছর তাঁদের অপেক্ষায় থাকি, তাঁদের মধ্যেও হয়তো কেউ কেউ একইভাবে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। এঁদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ বছরে ওই একবারই হয়, আর প্রতিবারই মনে হয় যেন আমার আয়ু আরও কিছুদিন বেড়ে গেল। আমার কাছে উৎসবের কেনাকাটা বলতে বই কেনা ছাড়া আর অন্য কিছুই নেই। অন্য কোন অনুষ্ঠানে গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি আমার প্রিয় বই উপহার দিয়ে থাকি।
বিশ্বব্যাপী বাঙালির বৃহদাংশের আরেকটি প্রিয় উৎসব ইদ। এই উৎসব নিয়ে আমার গত দুই দশকের এক অনন্য অভিজ্ঞতার কথা আমি বারবার বিভিন্ন জায়গায় বলেছি। এখানে আরেকবার বলা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি, কারণ আমি মনে করি এসব অভিজ্ঞতাই একজন গর্বিত বাঙালি হিসেবে আমার ভ্যালিডেশন । আমার বাড়ির আশেপাশে কোথাও কোনও মুসলমান পরিবার নেই। প্রায় এক কিলোমিটার দূরে একটি মসজিদ, যেখানে বছরে অন্ততপক্ষে দুদিন আমি সপুত্র ইদের নামাজে যাই। মসজিদের ঠিক উল্টোদিকেই মন্দির – এমন সহাবস্থান এই বঙ্গেই মূলত দেখা যায়। তার কাছাকাছি একটি মুদিখানা, যার মালিক অগ্রজ বন্ধু সমীর ভৌমিক। দুই দশকেরও বেশি সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সমীরদা আমাদের পুত্রেরও আশৈশব প্রিয় সমীর জেঠু। একেবারে কচি বয়স থেকেই ছেলে ইদ বলতে জানে মসজিদ থেকে বেরিয়ে সমীর জেঠুর সঙ্গে কোলাকুলি, তারপর জেঠুর দেওয়া একটি চকলেট কম্বো নিয়ে বাড়ি ফেরা। করনাকালের লকডাউন বাদ দিলে আজ পর্যন্ত এর অন্যথা হয়নি। এখন তো ছেলে বড় হয়ে গেছে, কিন্তু এই জেঠু-ভাইপোর উৎসব উদযাপন যেমন আগে ছিল তেমনই আছে। সমীরদার চোখে আমার পুত্র এখনও সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুটি, যে তার প্রিয় জেঠুকে দেখামাত্রই কোলে ঝাঁপ দিতে চাইত।
শারদোৎসব আরেকটি উৎসব যা বিপুল সংখ্যক বাঙালির প্রিয়তম উৎসব। সীমান্তের ওপারে যেমন ইদ, এপারে এটা বাঙালির বৃহত্তম উৎসব। আমার বাড়ির প্রায় দেয়াল ঘেঁসে আমাদের পাড়ার দুর্গাপুজোর প্যান্ড্যাল তৈরি হয়। মহানবমীর মহাভোজে পাড়ার সবাই একত্রিত হন। পুজোর ছুটিতে শহরে থাকলে আমরাও এই নির্মল আনন্দে ভাগ বসাই। এবছর ষষ্টি আর সপ্তমী দুদিনই বেশ কয়েকবার পরপর শুনলাম শিব তাণ্ডব (জটাটবীগলজ্জলপ্রবাহপাবিতস্থলে গলেবলংব্য় লংবিতাং ভুজংগতুংগমালিকাম্…) ও ‘দে দে পাল তুলে দে, মাঝি হেলা করিস না, ছেড়ে দে নৌকা আমি যাব মদিনা।’ দুটো গানই দুর্গোৎসবের মঞ্চে। একটাতে শিবের স্তুতি, আরেকটাতে মোহাম্মদের কথা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এ এক অনন্য নিদর্শন, যা অন্তত আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে দেশের অন্য কোথাও অকল্পনীয়।
বসন্ত পঞ্চমীতে সরস্বতী বন্দনা বাঙালির মতো আর কেউ এতটা আনন্দে-আড়ম্বরে করে বলে মনে হয় না। সীমান্তের এপার হোক কিংবা ওপার, বাঙালির চিন্তা চেতনায় আর আরাধনায় বাগদেবী যেমনভাবে রয়েছেন তা আর অন্য জাতির ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, গতবছর বাংলাদেশে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের বাড়বাড়ান্তে টালমাটাল পরিস্থিতিতেও কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই ৭৪টি সরস্বতী পুজোর প্যান্ড্যাল ছিল। বাংলার বাইরে অন্য কোথাও এমনটা অকল্পনীয়। পশ্চিমবঙ্গে, ত্রিপুরায় এবং আসামের বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়ও বলাই বাহুল্য একই চিত্র। প্রতিবারই বসন্ত পঞ্চমীতে বিশ্বাসী বাঙালির চিন্তা-চেতনায়, তাঁদের আনন্দে-উদযাপনে, তাঁদের আরাধনায়, বীণাপাণি তাঁর বীণা হাতে থাকেন স্বমহিমায় ।
পশ্চিমবঙ্গে আরেকটা ব্যাপার আছে যা অন্য অনেক জায়গায় কল্পনাই করা যায় না। পুজোর মূল উদ্যোক্তা মুসলমান, ইদ কিংবা মিলাদের অনুষ্টানে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায় একজন হিন্দু – এমন ঘটনা পশ্চিমবঙ্গে সচরাচরই দেখা যায়। সরস্বতী পুজোর জোর ক্ষেত্রে আমি প্রতি বছরই এরকম বহু ঘটনার সাক্ষী থাকি। উদাহরণস্বরূপ, বসন্ত পঞ্চমীতে এমন একটি সংস্থায় আমি প্রতিবছর আমন্ত্রিত থাকি যাতে কিনা মূল উদ্যোক্তা একজন মুসলিম মহিলা, তাঁর হিন্দু স্বামী এবং তাঁদের কন্যা। আমি সুযোগ থাকলেই এইসব নিখাদ আন্তরিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে আনন্দে ভাগ বসাতে যাই। যেতে যেতে দেখি, চারিদিকে আনন্দময় উৎসবমুখর পরিবেশ। সেজেগুজে বেরোয় অগণন ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ সর্বত্র। এছাড়াও রবীন্দ্র জয়ন্তী, নজরুল জয়ন্তী, পয়লা বৈশাখ সহ আরও অজস্র উৎসব অগণন মুক্তমনা অসাম্প্রদায়িক বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবে পরিচিত। আজকের দিনে যখন সর্বত্রই একটা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তার মোকাবিলা করতে আমাদের সংস্কৃতির এই অমুল্য উপাদানগুলো বাঁচিয়ে রাখা সকল বাঙালির একান্ত কর্তব্য। এই কর্তব্য পালনেই দ্বিতীয় বৃত্তের উৎসব সংখ্যা একটি সরল ও আন্তরিক প্রয়াস। এসবের মধ্যেই বেঁচে থাকুক সারা বাংলা, বেঁচে থাকুক উৎসবপ্রিয় বাঙালির বাঙালিত্ব।