Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বেড়া ভাসান মেলা : ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ 

অর্ঘ্য রায়চৌধুরী 

গঙ্গা ও পদ্মা বিধৌত এই বিরাট বঙ্গদেশে বিবিধ প্রকার মেলার জন্ম হয়েছে‌। অবিভক্ত বঙ্গের দিকে যদি অবলোকন করি, তাহলে বাঙালির ধর্মীয় এবং সামাজিক সহাবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাংলার জনপদে বহু বিচিত্র এবং বর্ণময় মেলার মৌলিকত্বটি একটি একাত্মতার আবহ সৃষ্টি করে। “মেলা”  শব্দটির উদ্ভব মিলন থেকে। যেখানে কোনো সামাজিক এবং ধর্মীয় উপলক্ষে জাতি, ধর্ম, অর্থ, বর্ণ নির্বিশেষে ভেদাভেদহীন মিলন সংঘটিত হয়, তাই মেলা।

এরকমই একটি মেলা হলো মুর্শিদাবাদের বেড়া ভাসান। এটি মূলত মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের লৌকিক জলদেবতা খাজা খিজিরের নামে পালিত হলেও এর সঙ্গেই গঙ্গাদেবীর পুজোও করা হয়। হিন্দু মুসলিম মিলনের এরকম নজির আর আছে কিনা জানা নেই। 

প্রতিবছর ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার বেড়া ভাসান উৎসবটি পালিত হয়। এই উৎসবের সূত্রপাত মুঘল আমলে। ষোড়শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট সুলতান জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবেদার মুককরম খান ঢাকাতে এই বেড়া ভাসান উৎসবের  সূত্রপাত করেন। পরবর্তীকালে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব মুর্শিদকুলী খান মুর্শিদাবাদেও এর প্রচলন করেছিলেন ।

এই উৎসবে হাজারদুয়ারী থেকে কামান লাগার সঙ্গে সঙ্গে ভাগীরথী বক্ষে ভাসমান বাঁশ এবং কলা গাছ নির্মিত ভেলার দড়ি কেটে দেওয়া হয়। সুদৃশ্য এবং আলোকজ্জ্বল বেড়া তথা ভেলাগুলি ভাগীরথী বক্ষে সারিবদ্ধভাবে ভাসমান হলে জলে তার প্রতিবিম্ব ঝলসে ওঠে, এবং মনোরম এক দৃশ্যর সূচনা হয়। মনে হয় যেন ধনপতি  চাঁদ সওদাগর তাঁর সপ্তডিঙা মাধুকরী ভাসিয়ে বানিজ্য যাত্রা করেছেন। এই মেলায় খাজা খিজির এবং গঙ্গার কাছে সুখ, সমৃদ্ধি এবং আরোগ্য কামনা করা হয়। বাংলার বানিজ্যপোত যাতে নির্বিঘ্নে বন্দরে বন্দরে পণ্য বহন করতে পারে সেই কামনায় প্রাচীনকালে বঙ্গদেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ীরাও এতে সামিল হতেন, এবং উত্তাল ভাগীরথীর বুকে মৎস্যজীবিরা যেন বিপদে না পড়েন, সেই প্রার্থনাটিও  একইসঙ্গে উচ্চারিত হয়।

এই ভেলাগুলি মেলার সবিশেষ দ্রষ্টব্য। বিবিধপ্রকার নয়নাভিরাম নির্মাণে এগুলির কোনোটিতে মসজিদ, কোনোদিতে পবিত্র কোরানের বাণী, আবার কোনোটিতে গম্বুজ এবং বিভিন্নপ্রকার দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য ফুটিয়ে তোলা হয়। বেড়াগুলি ভাগীরথীর স্রোতে ভাসমান হতেই গান বেজে ওঠে। গানের মধ্যে দিয়ে ধ্বনিত প্রার্থনার সুর দিগন্ত জুড়ে প্রার্থনার প্রদীপ জ্বালিয়ে তোলে।

এই মেলা উপলক্ষে লালবাগের হাজারদুয়ারি সংলগ্ন এলাকায় বিরাট মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। দূর দূরান্ত থেকে গ্রাম বাংলার ব্যবসায়ীরা তাঁদের পসরা সাজিয়ে বসেন। বিভিন্ন সাংসারিক সামগ্রী, তৈজসপত্র, সুস্বাদু এবং মুখোরোচক খাদ্যসম্ভার, খেলনা, ঘর সাজানোর জিনিসপত্র সবই এই মেলায় পাওয়া যায়। 

বেড়া ভাসান মেলা তথা উৎসব মুর্শিদাবাদ তথা বাংলার এক মৌলিক পরিচয় বহন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এরকম নজির বিশ্বমেলার প্রাঙ্গণে বিরল। ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রাপথটি অতিক্রম করেও মহাকালের মসনদে মেলাটি মনোমুগ্ধকর মিলন সংঘটিত করেছে।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x