Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

সহরায়

পরিমল হাঁসদা, বাঁকুড়া

ভারতের আদি অধিবাসী তথা আদিবাসীদের মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম। জনসংখ্যার দিক থেকে গোন্ড ভিলের পরেই তাঁদের স্থান। ভারতের অন্যান্য অনেক আদিবাসীদের ভাষা সংস্কৃতি হারিয়ে গেলেও সাঁওতালদের মধ্যে টিকে আছে তা অবিকৃত অবস্থায়। সাঁওতালরা প্রধানত কৃষিজীবী সম্প্রদায়। এই কারণে তাঁদের পূজা অর্চনার মধ্যে কৃষি সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় হল সাঁওতালি সংস্কৃতিতে পূজা অর্চনায় মন্ত্রপূতএর চেয়ে পূজা ও উৎসব কেন্দ্রিক নাচ গানের গুরুত্ব বেশি আরোপ করা হয়। উল্লেখ করার মত সাঁওতালদের উৎসব হল মাঘসিম, বাহা,সেন্দ্রা, মাগ মরে, এরগ সিম, হারিয়াড় সিম, জান্থার, দানসায়, সহরায়, সাহারলুন্ডা,সাকরাত,কারাম ইত্যাদি। প্রসঙ্গক্রমে আমরা সহরায় নিয়ে আলোচনা করব।


সহরায় হল সাঁওতালদের সর্ব বৃহৎ উৎসব। বঙ্গাব্দ হিসাবে কার্তিক মাসের অমাবস্যার পর থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত সহরায় উৎসব চলতে থাকে। কার্তিক মাসে সহরায় উৎসব হয় বলে সাঁওতালি ভাষায় কার্তিক মাসকে সহরায় মাস বলা হয়। পাঁচ দিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সহরায় উৎসব সম্পন্ন হয়।


এই অতি বৃহৎ উৎসবের জন্য সহরায়কে “হাতি লেকান সহরায়” অর্থাৎ বৃহৎ পশু হাতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। সহরায় কথার অর্থ হল নিক্ষেপ করা অথবা নিয়ে আসা। প্রায় পাঁচ ছয় মাস ধরে খেত খামারে হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর হাঁড়িতে নতুন চালের ভাত জুটে সুখ শান্তি সমৃদ্ধি নিয়ে আসে বলে উৎসবকে ওই নামে অভিহিত করা করা হয়েছে। সহরায় উৎসব গ্রাম্য পঞ্চজনের তত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। এরা হলেন মাঝি, গডেত, জগমাঝি, নায়কে,পারানিক। যেহেতু এই উৎসবে যুবক যুবতীরা সারা রাত ধরে নাচ গান করে তাই জগমাঝি বাবার বিশেষ ভূমিকা থাকে কারণ জগমাঝি বাবার কাজই হল গ্রামের যুবক-যুবতীদের দিকে খেয়াল রাখা।


নিম্নে সহরায় পরবের পাঁচ দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল –


প্রথম দিন: সহরায় উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয়”উম মাহা” অর্থাৎ স্নানের দিন। এই দিনের মধ্যেই সাঁওতাল রমণীরা ঘরের দেয়াল লেপন করে তাতে নানারকম পশু পাখি গাছ ফুল দিয়ে চিত্রিত করেন। অন্যদিকে গোডেত বাবাও সকাল হলে ছেলে ছোকরার দলবল নিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে মুরগি বাচ্চা ও চাল সংগ্রহ করেন। সবাই দুপুরের আগে স্নান সেরে নেন। তারপর গ্রামের পুরুষ মানুষরা মাদল ধমসা বাজিয়ে নায়কে বাবাকে পূজার স্থান “গট টান্ডি”তে নিয়ে যান। নায়কে বাবা গটটানডিতে মুরগি বাচ্চা উৎসর্গ করার জন্য আতপ চালের গুঁড়ি দিয়ে “খোন্ড” তৈরি করেন এবং তাতে দুটো ডিম উপুড় ভাবে রেখে দেন।
আরাধ্য দেব দেবী মারাং বুরু,জাহের এরা, মরেক- তুরুইকো এবং সীমা সাড়ের উদ্দেশ্যে মুরগি বাচ্চা উৎসর্গ করার পর সেগুলো খিচুড়ি প্রসাদ করা হয়। খিচুড়ি প্রসাদ খাওয়া হলে গোধূলি বেলায় গোরুর পাল গট টানডি তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং যে গোরুটি প্রথমে খোন্ডে রাখা ডিম দুটোকে মাড়ায় তার শিংএ তেল সিঁদুর মেখে দেওয়া হয়। গোরুর মালিককে পরের বছরের জন্য এক কলসী হাঁড়িয়া ধার্য করা হয়।কর্মসূচি চলাকালীনই মাঝি বাবা মুরুব্বিদের নিয়ে পাঁচ দিনরাত্রি যুবক যুবতীদের বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি ঘোষণা করেন।গট টানডির কাজকর্ম শেষ হলে পূর্বের ন্যায় নায়কে বাবাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।


এদিকে বাড়ির মহিলারা সন্ধ্যার আগেই ঘরের দুয়ার থেকে গোয়াল ঘর পর্যন্ত আলপনা এঁকে রাখেন। গোরু মোষরা সেই আল্পনাতে পা রেখে রেখে গোয়াল ঘরে প্রবেশ করে। গোরু মোষ গোয়ালঘরে প্রবেশ করলে তাদের শিংএ তেল মেখে পরিচর্যা করা হয় এবং প্রদীপ দূর্বাঘাস দিয়ে আরতি করা হয়। সারারাত ধরে পুরুষরা ধমসা মাদল ও গানের তালে গোরু মোষ জাগিয়ে রাখেন এবং বাড়িতে বাড়িতে চাল সংগ্রহ করেন।
দ্বিতীয় দিন:এই দিনকে “বঙ্গা মাহা” বলা হয়। এই দিন আত্মীয় স্বজনরা এসে উপস্থিত হন। মাংসের আয়োজন করা হয় বলে এই দিনটিকে “জেল দাকা ” মাহাও বলা হয়।
এই দিন অনেক বাড়িতে রাত্রি বেলা গৃহ দেবতা দের আরাধনা করা হয়। তবে গৃহ দেবতাদের প্রতি বছর আরাধনা করার প্রয়োজন পড়ে না। সামর্থ্য অনুযায়ী তিন বছর,পাঁচ বছর অন্তর করলেই হয়। গৃহ দেবতাদের উদ্দেশ্যে ছাগল ,মুরগি, শুকর বলির প্রচলন রয়েছে। গৃহ দেবতাদের নাম শুধু গৃহকর্তায় জানতে পারেন। মাংস পিঠের গন্ধে গ্রামের আকাশ বাতাস মম করে ওঠে।তারপর সারা রাত ধরে চলে গ্রামের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহরায় নাচ গানের আসর।
তৃতীয় দিন: এই দিনটাকে খুন্টাও মাহা বলা হয়। অর্থাৎ গোরু খুটানোর দিন। সকালের দিকে গোরু মোষকে খুঁটিতে বেঁধে গোরুর চামড়া দিয়ে লেলিয়ে দেওয়া হয়। চাষের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র পাতি কে পুকুর থেকে ধুয়ে এনে আরাধনা করা হয়। ডানটা, রিঞ্জা প্রভৃতি নাচ গান করা হয় এই দিনে।
চতুর্থ দিন: এই দিনকে জালে মাহা বলা হয়। এই দিন মাংসের বদলে মাছের ব্যাবস্হা করা হয়। সহরায় নাচের পাশাপাশি ডাহার, মাতোয়ার, লাগরে নাচ প্রদর্শন করা হয়।
পঞ্চম দিন: এই দিনকে জাঞ্জলে মাহা বা গাদই মাহা বলা হয়। এই দিন আত্মীয় স্বজনরা বিদায় নিতে শুরু করে। সহরায় গানের সুরে বিরহের ছায়া প্রতিফলিত হয়। বিকেল দিকে গ্রামের যুবক যুবতীরা ঘরে ঘরে নাচ গান করে চাল ডাল তেল নুন মসলা সবজি আদায় করে এবং তা রাতে খিচুড়ী করে খাওয়া হয়। এইভাবে পাঁচ দিনের সহরায় উৎসব ধুমধাম করে উৎযাপিত হয়।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x