মধুরিমা দে , হালিসহর, উত্তর ২৪ পরগনা
পশ্চিমবঙ্গ
আজ ৫ জুলাই, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি। বাঙালির প্রিয় রথযাত্রা উৎসব। রন্টির সকাল থেকেই মনটা খুব খুশি। এই খুশি অন্যান্য দিনের চেয়ে অন্যরকম! আকাশের মেজাজও বেশ তরতাজা। গত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ার পর সকাল থেকেই রোদ উঠেছে। রন্টি আজ প্রথমবার রথ টানবে। এই রথ টানা আসলেই ঈশ্বরকে ভক্তের ভক্তি ও ভালোবাসা প্রকাশের একটি প্রতীক। দাদু মানিক রতন দস্তিদার গতকাল সকাল থেকেই ব্যস্ত সেই রথ তৈরী করতে। আদরের দাদুভাই প্রথমবার রথ টানবে বলে কথা! তাই তিনি নিজের হাতে রথ তৈরী করে দিচ্ছেন।
রন্টি তো এ-ঘর থেকে সে-ঘর খুশিতে লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে। একবার দাদুর কাছে যাচ্ছে তো আরেকবার ঠাকুরমার কাছে। তার কত কত প্রশ্ন জগন্নাথ দেবকে নিয়ে ! ঠাকুরমা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে নাতির সব প্রশ্নের উওর দিচ্ছেন। রন্টি সবটা বুঝতে না পারলেও সে কিন্তু গভীর মনোযোগ দিয়ে ঠাকুরমার পাশে বসে সব কথাগুলো মন দিয়ে শুনছে।
রন্টি খুব ছোটবেলা থেকেই দাদু ও ঠাকুরমার কাছেই থাকে। বাবা মা দুজনই কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। তাই ছোটবেলা থেকে রন্টির সব আবদার দাদু এবং ঠাকুরমার কাছেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। দাদুর রথ বানানো প্রায় শেষ। দাদু খুব সুন্দর করে ফুলের মালা দিয়ে রথ সাজিয়ে দিয়েছেন। ঠাকুরমা জগন্নাথ দেব, দাদা বলরাম ও বোন সুভদ্রাকে রথে বসিয়ে দিলেন খুব যত্ন করে। একটা থালার মধ্যে গুজিয়া,কলা, বাতাসা, নকুল দানা আর একটা ছোট গ্লাসে জল দিয়ে প্রসাদের থালা সাজাতে সাজাতে নাতিকে বললেন, ‘খুব সাবধানে রথ টানবে দাদুভাই। জগন্নাথ দেব যেন উল্টে না পড়েন। পাড়ায় সবার বাড়ি যাবে। সবাইকে নিজের হাতে করে প্রসাদ দেবে।’
বিকেল প্রায় পড়ন্ত। কাঠের রথের একপাশে জ্বলছে পঞ্চবটী ধূপ। তুলসীমঞ্চ জুড়ে মন মাতানো ধূপের গন্ধ। ঠাকুরমা শাঁখ বাজিয়ে নাতিকে বললেন, ‘এবার জগন্নাথ দেবকে তার মাসির বাড়ি রেখে এসো দাদুভাই।’
রন্টি ধীরে ধীরে সদর দরজা দিয়ে বেরোতে যাবে, ঠিক এমন সময় একজন লোক এসে দাঁড়ল দরজায়! বলল, ‘ছেলে কিছু ভিক্ষে দিবি রে’! রোগা ছিপছিপে চেহারার লোকটার বুকের হাড়গুলো যেন স্পষ্ট গোনা যাবে। পরনে হলদে পাড়ের সাদা ধুতি। গলার পিছনের দিক দিয়ে দড়ি দিয়ে ঝোলানো ভিক্ষের ঝুলি। তার কাঁধ থেকে দুটো হাত নেই!
পাঁচ বছরের রন্টির শরীর মূহুর্তে শিউরে উঠল, সে রথের দড়ি মাটিতে রেখে চিৎকার করে ঠাকুরমাকে ডেকে বলল, ‘ঠাম্মা ঠাম্মা! দেখো, তোমার জগন্নাথ এসেছে!’
ঠাকুরমা বাইরে এসে দেখেন,তার নাতি নিজের হাতে সেই অতিকায় শীর্ণ লোকটিকে প্রসাদ খাইয়ে দিচ্ছে…ঠাকুরমা নিজের অজান্তেই যেন চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘জয় জগন্নাথ, জয় জগন্নাথ’ !