Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

বাংলা গানের দুই ঐশ্বর্য্য — সতীনাথ ও প্রতুল

অলক রায়চৌধুরী

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ

সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

মোহিতলাল মজুমদারের কবিতার সাথে মিলে গেল ভাস্কর বসুর গানের কথা। সে গান গাইবেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। গানের প্রথম কলি “সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলংকার।” সুর করেছেন সুধীন দাশগুপ্ত। ভাস্কর চাইছেন অলংকারকে অহংকার করতে। নারাজ সতীনাথ। অভ্যাস করে ফেলেছেন যে! রেকর্ড হয়ে সে গান বাজারে বেরোনো মাত্র জনপ্রিয়তা এবং কোর্টের কেস দুটোই পেলো সমারোহে। মোহিতলালের প্রকাশক মামলা ঠুকেছেন। সে মামলার পরিণতি কী হয়েছিল জানা নেই, কিন্তু সেই সোনার কণ্ঠের শতাধিক মরমী গান আজও শ্রোতার হৃদয়ে অক্ষয় অব্যয়। খোদ লতা মঙ্গেশকার ওঁর গলায় ভজন শুনে চেয়ে নিয়েছিলেন শারদ অর্ঘ্যর পুজোর গান। আকাশ প্রদীপ জ্বলে আর কত নিশি গেছে নিদহারা সেই অমল দুটি গান।

বাংলা গানে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের কোনো কপি হয় নি। প্রধান ছাত্র জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় বলতেন উত্তরভারতীয় প্রায় সব সংগীতধারা কণ্ঠস্থ ছিল সতীনাথবাবুর। বিস্ময়কর প্রতিভা, কিন্তু সম্মান পেলেও সেই অর্থে বাজারধন্য হয়নি তাঁর গান। অর্থ পান নি। অর্থের কষ্ট ছিল বরাবর। বড়ে গোলাম আলি খাঁ-র স্নেহধন্য সতীনাথবাবুর গান স্মৃতিতে হাতড়াতে হয় না। একটির পেছনে আর একটি চলে আসে। বনপথ মাঝে, জীবনে যদি দীপ, কত না হাজার ফুল, এলো বরষা, আমার এই গানে, পাষাণের বুকে লিখোনা, উৎপলা সেনের সাথে দ্বৈত মাঝে নদী বহেরে, রাতের আকাশ, যেদিন জীবনে তুমি – এ তালিকা কি আর শেষ হয়!

দুঃখের গানের পূজারী — নাম দিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই হেমন্তবাবুর জন্য ‘তোমার আমার কারো মুখে কথা নেই’ তৈরী করে আনলেন সতীনাথ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান — জীবনের এ এক মাইলফলক সন্দেহ নেই। শিল্পীদের সাথে সহমর্মিতায় অদ্বিতীয় সতীনাথ সারা ভারতবর্ষে শীর্ষ গজল গাইয়েও ছিলেন তাঁর সময়ে। তবে আশ্চর্য কোনো এক বা একাধিক কারণে সেই অর্থে প্লে ব্যাকে ডাক পান নি। সে নিয়ে অবশ্য কোনো খেদ ছিল না।

দীপক মৈত্রদের মতো ছাত্র গড়েছেন যাঁর গলার কিংবদন্তী গায়ন ‘এ তো নয় শুধু গান ‘- এ সুরকার হিসেবে সমুজ্জ্বল আছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। নিখুঁত নজরুল গীতির প্রচার প্রসারেও তাঁর নামটি স্মরণীয়। ‘আমি চিরতরে দূরে ‘,’রুমাঝুমা ‘, ‘ কে বিদেশী ‘ — এসব গানে নজরুলের সুরের বিভা ঠিকরে বেরিয়েছে তাঁর গলা থেকে। আকাশবাণীর অডিশনে বারবার অনুর্তীর্ণ সতীনাথবাবুকে সম্মানের আসন দিয়েছিলেন তৎকালীন আকাশবাণীর কেন্দ্র অধিকর্তা। আর শ্রোতারা দিয়েছেন প্রশস্থ হৃদয়ের প্রশ্রয়। স্ত্রী উৎপলাকে নিয়ে দশকের পর দশক সে সব হৃদয়ে সুর বপন করেছেন শিল্পী, যার অনুরণন চিরস্থায়ী।

শতবর্ষে সেই মরমী গায়ককে সেলাম।

**********

প্রতুল মুখোপাধ্যায়

গান যে জীবনের আর এক নাম, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান সামনাসামনি যাঁরা শুনেছেন, জানেন তাঁরা। প্রচারের ঢাক-ঢোল নেই, মঞ্চে নেই হারমোনিয়াম, নেই তবলা। কাঁধে ঝোলা, মুখে প্রতিজ্ঞার হাসি। গাইতে বললেই রাজি।

ঘাটে, বাটে, মাঠে। শুধু মাইক্রোফোনের সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর সময়টুকু দিতে হবে । যে কোনো মাইক্রোফোন, যে কোনো মঞ্চ। সে ডেকার্স লেনের বেঞ্চ বা ডাক্তার বারীন রায়ের দাঁত সারানোর চেম্বার–যেখানেই হোক না কেন। খ্যাতির বর্ষাতি তুচ্ছ করেছেন, প্রতিজ্ঞায় থেকেছেন কঠোর। একবার এক অর্গান প্লেয়ার কী বোর্ড বাজিয়ে সুমধুর করতে চেয়েছিলেন ওঁর গান, সবিনয়ে তাঁকে নিরস্ত করে বললেন, “আমার গানের সমস্ত দোষ বা গুণ আমার একার। আপনি দায় নিতে যাবেন কেন?”

ভগ্নস্বাস্থ্যেও যেভাবে দম একত্রিত করে গাইতেন, সে নিয়েই একটা তথ্যচিত্র হতে পারে। পাশ্চাত্যের গাইয়েরা যেভাবে ভয়েস ট্রেনিং করতেন, প্রতুলদা সেই ধাঁচের সাধনা করতেন, একদম নিভৃতে। কেবল “আমি বাংলায় গান গাই ” নয়, গৌরব করার মতো গান প্রতুলবাবুর ঝোলায় ছিল অনেক। স্টেকাটো ফর্মের সাথে হারমোনির জমাট মিশেল ছিল ওঁর গান। বিষয়ও দুরন্ত।

দুটি একটি বলি। ভয় পাসনা ছেলে, ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে, তোমার কি কোনো তুলনা হয়, হ য ব র ল বাংলা গানে বহু প্রতীক্ষার সমকাল, যার ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল প্রতুলবাবুর গান। ওঁর শ্রোতারাও ওঁরই মতো বাউন্ডুলে। প্রতুলবাবুর হাত বাজতো, মুখ বাজতো। শ্রোতারাও জুটে যেতেন, জুড়েও যেতেন। বিবিসি এক সমীক্ষায় বলেছিলো রবীন্দ্রনাথের পরে “আমি বাংলায় গান গাই” সারা পৃথিবীর বাঙালির মুখে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান।

প্রতিষ্ঠিত অনেক গায়কই প্রতুলবাবুর গানে এই সিদ্ধি এবং সমৃদ্ধি বাঁকা চোখে দেখেছেন। বলেছেন, বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের পোষা গাইয়ে তিনি। এসব ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে জানতেন ব্যাংকের খুব বড় মাপের এই বড় বাবুটি। সুর ছিল পোষা পাখি, হাত ছিল ওঁর গানের তালবিভাগ আর ছন্দবিভাগের অস্ত্র।

খোকন দিলো সাগর পাড়ি, কুট্টুস কাট্টাস, শোনো বন্ধুগণ এবং এমন অনেক গানে প্রতুলবাবুর গোটা শরীরটাই গানে পরিণত হতো। গায়ক তখন নিজেই সাক্ষাৎ সিনেমা। মঞ্চের বা ডিস্ক গাইয়ে তিনি নন। তাঁর গান শুনে বাদল সরকারের নাটক মনে আসত। নিরাভরণ, গহন, শুদ্ধ, ছুঁচের মতো ভেদশক্তি তার।

দুঃখের, এমন গানের উত্তরাধিকার থাকলো না। এই শ্রম, সাধনা আর নিরাসক্ত ব্যক্তিত্ব দিয়ে এ যুগে কে আর নিজেকে গড়বেন? একদা এক রামছাগল, পিঁপড়ে গেলেন শুনতে শুনতে চোখের কোণ ভারী হচ্ছে।

স্টারডামের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে গেলেন অতুল ঐশ্বর্যের প্রতুল।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x