Skip to content

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন

শারদীয়া সংখ্যা ১৪৩২

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

সুচরিতা সেনব্যানার্জী

বস্টন, যুক্তরাষ্ট্র

ভারতীয় সংস্কৃতির একটি অমূল্য রত্ন হল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত। এর শিকড় বহু প্রাচীন কালের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে জড়িত। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য, সাধনা ও প্রজ্ঞার ফলশ্রুতিতে গড়ে ওঠা এই সংগীতরীতি শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি আত্মার সঙ্গে সঙ্গীতের এক গভীর সংলাপ। এটি কেবলমাত্র সংগীতের একটি ধারা নয়, বরং দীর্ঘকালের সাধনার ফসল, যেখানে সুর, তাল, ছন্দ, ভাব এবং আত্মার মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সংযোগ সৃষ্টি হয়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত আমাদের প্রাচীন ঋষি-মুনি, সাধক এবং গায়কদের অভিজ্ঞতা, দর্শন ও আত্মজ্ঞানের ফল। এই সংগীত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের দর্শন, যা হৃদয়কে স্পর্শ করে, মনকে প্রশান্ত করে এবং আত্মাকে জাগ্রত করে। এর উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন বৈদিক সাহিত্য, বিশেষ করে সামবেদ-এ। সামবেদ ছিল মূলত ভগবানের উদ্দেশ্যে গীত গেয়ে যজ্ঞে পরিবেশন করার একটি রীতি। এই বৈদিক স্তোত্রই পরবর্তীতে বিভিন্ন ধারার সংগীতের রূপ নেয়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রথম প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে ধরা হয় ভরতমুনির “নাট্যশাস্ত্র”। এখানে সংগীত, নৃত্য ও নাটকের মধ্যে সম্পর্ক বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পরবর্তীকালে “সঙ্গীতরত্নাকর”, “সঙ্গীতদামোদর”, “সঙ্গীত পারিজাত” ইত্যাদি নানা গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচিত হয়েছে, যা ভারতীয় সংগীতকে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কেবলমাত্র বিনোদনের উপকরণ নয়, এ এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন। রাগ গাওয়ার মাধ্যমে গায়ক ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। তাই এই সংগীতকে অনেক সময় “নাদযোগ” বা ধ্বনির মাধ্যমে আত্মসন্ধানের পথও বলা হয়। অনেক রাগ ও রচনায় সরাসরি ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি প্রকাশ পায়—যেমন মীরাবাইয়ের ভজন, ত্যাগরাজের কীর্তন। বর্তমান যুগে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বে এটা সমাদৃত হয়েছে। এখন সারা বিশ্বে পরম্পরাগত  শাস্ত্রীয় সংগীতানুষ্ঠান খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছ। উপরন্তু, অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল রেকর্ডিং’এর মাধ্যমে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এর মূল আধ্যাত্মিকতা ও গুরু-শিষ্য পরম্পরারগত শিক্ষার গুরুত্ব আজও প্রাচীনকালের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত প্রধানত দুই শাখায় বিভক্ত—উত্তর ভারতের হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত এবং দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটিক শাস্ত্রীয় সংগীত। এই দুই শাখাতেই কণ্ঠসংগীত এবং বাদ্যযন্ত্রর মাধ্যমে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়ে থাকে। যদিও এই দুইটি ধারার উৎপত্তি একই সংস্কৃতি থেকে, কালের বিবর্তনে তারা কিছুটা স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করেছে।

হিন্দুস্তানি সংগীত

উত্তর ভারতে প্রচলিত এই ধারাটি মূলত মধ্যযুগে পারসিক ও মুঘল প্রভাবের ফলে একটি স্বতন্ত্র রূপ পায়। এটা মূলত দিল্লি, লখনউ, বারাণসী, গোয়ালিয়র, মাইহার, আগ্রা, কীরানা, বিষ্ণুপুরী ও পাতিয়ালায় প্রসার লাভ করে। হিন্দুস্তানি সংগীতে খেয়াল, ধ্রুপদ, ঠুমরি, দাদরা, ভজন প্রভৃতি রচনার ধরণ ব্যবহৃত হয়। তানপুরা, তবলা, সরোদ, সেতার, সানাই, হারমোনিয়াম ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এই ধারায় ব্যবহার করা হয়।

কর্ণাটিক সংগীত

দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত কর্ণাটিক সংগীত তুলনামূলকভাবে বেশি আধ্যাত্মিক এবং কম বাহ্যিক অলংকরণে বিশ্বাসী। এর মূল ভিত্তি ত্যাগরাজ, মুথুস্বামী দীক্ষিতর, শ্যাম শাস্ত্রী প্রমুখের রচনায় গড়ে ওঠে। কর্ণাটিক সংগীতে মৃদঙ্গম, বীণা, ঘটম, কানঝিরা, সরস্বতী বীনা, বেহালা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এই ধারায় বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়।

এই দুই শাখার মধ্যে অনেক অমিল থাকা সত্বেও কিছু অনবদ্য মিল বিদ্যমান।

এক:  রাগ

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মূল ভিত্তি হল “রাগ।” রাগ হল একটি নির্দিষ্ট সুরের ধাঁচ, যা কিছু নির্দিষ্ট স্বর বা নোটের মাধ্যমে গঠিত হয়। প্রতিটি রাগের একটি নির্দিষ্ট আবেগ ও রস আছে ।  কিছু কিছু রাগের নাম হিন্দুস্তানী এবং কর্ণাটিক শাখায় ভিন্ন কিন্তু রাগের পরিকাঠামো একই রকম। যেমন, হিন্দুস্তানী ভীমপালাসি রাগকে কর্ণাটিক সঙ্গীতে বলা হয় রাগ আভেরি, হিন্দুস্তানী রাগ দুর্গাকে কর্ণাটকিতে বলা হয় রাগ শুদ্ধ সাভেরি।

দুই: তাল

তাল হল ছন্দের কাঠামো। তাল না থাকলে সংগীত হবে অনিয়ন্ত্রিত ও এলোমেলো। প্রতিটি সংগীত রচনার নির্দিষ্ট একটি তাল থাকে। হিন্দুস্তানী সংগীতের কিছু প্রচলিত এবং জনপ্রিয় তাল হল তিনতাল, ঝপতাল, একতাল ইত্যাদি। কর্ণাটিক সংগীতে সাতটি মূল তাল ব্যবহার করা হয় – সেইগুলি হলো  ধ্রুব, মাত্য, রূপক, ঝাম্প, ত্রিপুটা, আটা এবং একা।

তিন: গুরু-শিষ্য পরম্পরা

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সবচেয়ে মহৎ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল গুরু-শিষ্য পরম্পরা। এই পদ্ধতিতে একজন গুরু তাঁর শিষ্যকে কেবল সংগীতের কৌশল শেখান না, বরং সংগীতের অন্তর্নিহিত দর্শন, আত্মসাধনা ও মানবিকতা শেখান। বর্তমান কালে সংগীত শিক্ষার অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যেখানে ছাত্রছাত্রীরা গুরুর থেকে সংগীতশিক্ষা লাভ করতে পারে। আধুনিক যুগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগীত শিক্ষার সুযোগ সহজলভ্য । কিন্ত কিছু কিছু জায়গায় “গুরুকুল প্রথা” আজও প্রচলিত যেখানে শিষ্যকে গুরুজির ঘরে বসবাস করে সংগীত শিক্ষা করতে হয়।

চার: প্রধান রচনার ধরন

হিন্দুস্তানি সংগীতে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, তারানা প্রভৃতি রচনার ধরণ বিদ্যমান। কর্ণাটিক সংগীতে  কীর্তন, কৃত্তি, রাগমালিকা, তিল্লানা প্রভৃতি জনপ্রিয়। এই প্রতিটি ধারার নিজস্ব সৌন্দর্য ও রচনাশৈলী রয়েছে।

এই দুই শাখার মধ্যে থাকা কিছু অমিল হলো —

এক: ঘরানা 

হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে “ঘরানা” শব্দটি একটি বিশেষ ধারার বা সঙ্গীত শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী শৈলীকেই বোঝায়। প্রতিটি ঘরানার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, রীতিনীতি, উপস্থাপনার ভঙ্গি এবং গায়কির পদ্ধতি থাকে। “ঘরানা পদ্ধতি” বলতে বোঝায় সেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার ধারাবাহিক প্রথা যা গুরু-শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। “ঘরানা” শব্দটির উৎপত্তি “ঘর” থেকে, যার অর্থ পরিবার বা বসবাসের স্থান। তবে সঙ্গীতে এর অর্থ হলো এক ধরণের সঙ্গীত চর্চা ও শিক্ষা যার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য শৈলী আছে যা গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রবাহিত হয়। ঘরানার মাধ্যমে একজন শিল্পী শুধু সঙ্গীতই শেখেন না, বরং এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ও শৈলীও আত্মস্থ করেন। উত্তর ভারতীয় বা হিন্দুস্তানী কণ্ঠসংগীতের প্রধান ঘরানাগুলি হলো গোয়ালিয়র ঘরানা, কিরানা ঘরানা, আগ্রা ঘরানা, পটিয়ালা ঘরানা, জয়পুর ঘরানা, বিষ্ণুপুর ঘরানা, লাখনৌ ঘরানা, বেনারস ঘরানা। এক একটি ঘরানা অনেক সময় একটি বিশেষ ধরণের গায়কীর জন্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, যেমন বিষ্ণুপুর ঘরানা ধ্রুপদের জন্যে, বেনারস ঘরানা ঠুমরির জন্যে বিখ্যাত। কিছু ঘরানা তারবাদ্যযন্ত্রের জন্যে বিখ্যাত – যেমন মাইহার-সেনিয়া ঘরানা;  তালবাদ্যের জন্যে বিখ্যাত ফারুকবাদ ঘরানা।

কর্ণাটিক সংগীতের শাখায় কোনো ঘরানা পদ্ধতি নেই ।

দুই: রাগ

হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগগুলি পরিবেশনের সময়ও নির্দিষ্ট করা আছে—যেমন রাগ ভৈরব সকালে, রাগ দরবারি রাত্রিতে গাওয়া হয়। প্রতিটি রাগের একটি নিজস্ব চরিত্র থাকে—কখনো তা আনন্দের, কখনো বিষাদের, আবার কখনো আবেগপ্রবণ বা ভক্তিমূলক।

কর্ণাটিক সংগীতের শাখায় রাগ পরিবেশনের কোনো নির্দিষ্ট সময় মেনে চলা হয়না।

তিন: রাগের ব্যাখ্যা ও পরিবেশনা রীতি

হিন্দুস্তানী সঙ্গীতে একটি রাগ উপস্থাপন শুরু হয় আলাপ দিয়ে — যেখানে রাগের মৌলিক সুর, মেজাজ ও চরিত্র ধীরে ধীরে তুলে ধরা হয়। এরপর আসে জোড়, ঝালা, বন্দিশ ও তান। এখানে রাগ পরিবেশনার সময় শিল্পীর নিজস্বতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক ভাবে কর্ণাটিক সঙ্গীতে রাগ পরিবেশিত হয় সাধারণত নির্দিষ্ট রচনার মাধ্যমে, যেমন কৃত্তি, ভরণাম্। এই সংগীতের পরিবেশনা রীতি অনেকটা গঠনতন্ত্র নির্ভর, যেখানে রয়েছে আলাপনা, নিরাভাল, রাগ -তান-পল্লবী, স্বরকাল্পনা ইত্যাদি। কর্ণাটিক সঙ্গীতে রাগ পরিবেশনের কোনো নির্দিষ্ট ক্রম ও সময় মেনে চলা হয়না।

চার: বাদ্যযন্ত্র ও তাল

হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হলো সেতার, সরোদ, তবলা, সারেঙ্গী, বংশী, সানাই, হারমোনিয়াম, তম্বুরা, রুদ্রবীনা, পাখোয়াজ, সুরবাহার ইত্যাদি । এগুলির মধ্যে তালবাদ্য হলো তবলা এবং পাখোয়াজ । হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের তালের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম: যেমন তিন তাল (১৬ মাত্রা), এক তাল (১২ মাত্রা), ঝাঁপ  তাল (১০ মাত্রা)।

কর্ণাটিক সঙ্গীতের বহুল ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র গুলি হলো: সরস্বতী বীণা, মৃদঙ্গম, গটাম, কানজিরা, তম্বুরা, বংশী, বেহালা । এগুলির মধ্যে মৃদঙ্গম, গটাম, কানজিরা প্রভৃতি তালবাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানে তালের ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি জটিল এবং বহু রকমের তাল বিদ্যমান। কর্ণাটিক সংগীতে যে সাতটি মূল তাল ব্যবহৃত হয় – (ধ্রুব, মাত্য, রূপক, ঝাম্প,ত্রিপুটা, আটা এবং একা), সেখান থেকে উৎপন্ন আরো অনেক তাল ব্যবহার করা হয় যেমন: আদিতাল (৮ মাত্রা), মিস্র চাপুউ (৭ মাত্রা), খান্ড চাপু (৫ মাত্রা)। এছাড়া কর্ণাটিক সঙ্গীতে তাল মেল, তাল মালা, নাদাই প্রভৃতি ব্যবহার দেখা যায়।

পাঁচ: ভাষা ও গানের বাণী

হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের গানে সাধারণত হিন্দি, ব্রজভাষা, উর্দু, ফার্সি, সংস্কৃত ব্যবহার হয়। গানের ধরন: খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, ভজন,তারানা, টপ্পা ইত্যাদি। জনপ্রিয় রচনাকার হলেন  উস্তাদ নেয়ামত খান (ছদ্মনাম সদারঙ্গ), উস্তাদ ফাইয়াজ খান (ছদ্মনাম প্রেমপিয়া ), উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খান (ছদ্মনাম সাবরঙ্গ)। এঁদের  প্রতিটি রচনায় তাঁদের ছদ্মনামের উল্লেখ আছ। এছাড়াও মীরাবাঈ, সুরদাস, তানসেন, কবীরও প্রচুর সঙ্গীত রচনা করেছেন যেগুলি বহুল প্রচলিত এবং আজও খুবই জনপ্রিয়।

কর্ণাটিক সঙ্গীতে প্রধান ভাষা হলো তেলেগু, তামিল, কন্নড়, মালায়ালম ও সংস্কৃত। জনপ্রিয় রচনাকার হলেন ত্যাগরাজ, মুথুস্বামী দীক্ষিতর, শ্যাম শাস্ত্রী। এছাড়াও পাটনাম সুব্রামানিয়া আইয়ের, মুঠিয়া ভাগাভাতার, লালগুড়ি জয়রামান, পুরন্দর দাস, এম. বালামুরলীকৃষ্ণ, বিশ্বনাথ শাস্ত্রী ইত্যাদি হলেন প্রসিদ্ধ কিছু রচয়িতা ।

ছয়: ভাবধারা ও উপস্থাপনার ধরন

হিন্দুস্তানী রাগ পরিবেশনায় শিল্পীর ব্যাক্তিগত ব্যাখ্যা, তাৎক্ষণিকতা, ভাবনা ও আবেগ প্রবণতা বড় ভূমিকা রাখে।

কর্ণাটিক সঙ্গীত হলো ভক্তিমূলক, যেখানে সুর ও তাল নিয়ে নির্দিষ্ট কাঠামোতে নিবদ্ধ। এটি আরও গাণিতিক, এবং তাল ও রচনার শুদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাগ পরিবেশনায় শিল্পীর ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা ও তাৎক্ষণিকতার (improvisation) বেশি সুযোগ নেই।

সাত: ভৌগোলিক বিস্তার ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

হিন্দুস্তানী সঙ্গীত মূলত ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চল জুড়ে চর্চিত হয় (উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, দিল্লি)। এবং পূর্বাঞ্চলে দুই বাংলা, আসাম ও ওড়িশা। এই ধারায় পারস্য, তুর্কি ও মুঘল প্রভাব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

কর্ণাটিক সঙ্গীত চর্চিত হয় দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশে। এটি মূলত একটি হিন্দু ভক্তিমূলক ভিত্তিসম্পন্ন ধারা ।এই ধারায় বহিরাগত প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।

আট: ইতিহাস এবং বিবর্তন

হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের গঠনমূলক রূপ গড়ে ওঠে ১৩শ-১৪শ শতকে, মুঘল আমলে, যেখানে পারস্যী রীতিনীতির সাথে ভারতীয় সংগীত মিশে এক নতুন রূপ পায়।

কর্ণাটিক সঙ্গীতের ইতিহাস আরও প্রাচীন—এটি সংহিতা যুগের সামবেদ ও ভরতমুনির নাট্যশাস্ত্র অনুসরণ করে চলে। রামানুজ, পুরন্দর দাস, ত্যাগরাজ ইত্যাদি সাধকগণ এর শৈলীর ভিত্তি স্থাপন করেন।

*****

হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কাঠামো

উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে রাগের মূল ভিত্তি  হলো “ঠাট” (Thaat)। হিন্দুস্তানী সঙ্গীতে ১০টি প্রধান ঠাট আছে, যার উপর ভিত্তি করে হিন্দুস্তানী শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগগুলি সৃষ্টি হয়েছে।.দশটি ঠাটগুলি হলো: বিলাবল, খামাজ, কাফি, আসাবরি, ভৈরবী, ভৈরব, মারওয়া, টোড়ি, কল্যাণ, পূর্বী। এই ঠাটগুলির ওপর ভিত্তি করে প্রায় ১০০ থেকে ১৬৪ টি রাগ তৈরি হয়েছে।হিন্দুস্তানী সঙ্গীত শাখায় সংযোগ রাগের ব্যবহার খুবই প্রচলিত – যেমন ইমন-কল্যাণ, আশাবরী-টোড়ি। এই ঠাটভিত্তিক রচনাগুলি রাগ-পরিবেশন এর নিয়ম অনুযায়ী পরিবেশন করা হয়। এই রচনাগুলি এক একটি নির্দিষ্ট তালে নিবদ্ধ এবং এইগুলি পরিবেশন এর সময় তবলা বা পাখোয়াজ তালবাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কার্নাটিক সঙ্গীতের কাঠামো

কার্নাটিক সঙ্গীতে কোনো ঠাট পদ্ধতি নেই। কার্নাটিক সঙ্গীতের কাঠামো নিম্নিলিখিত বিষয়গুলির ওপর নির্মিত:

এক: রাগ – কার্নাটিক সঙ্গীতে প্রায় ৭২টি মূল রাগ রয়েছে, যেগুলোকে বলা হয় “মেলকার্তা রাগ”যেগুলো থেকে আরো বহু জ্ঞানপুঞ্জ রাগ সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ: মায়ামালবগৌলা (Mayamalavagowla), শংকরাভরণম (Shankarabharanam), কল্যাণী (Kalyani) ইত্যাদি।

দুই: তাল (Tāla / তাল) – কর্ণাটিক সংগীতে সাতটি মূল তাল এবং তা থেকে উৎপন্ন আরো অনেক তাল ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কর্ণাটিক সঙ্গীতে তাল মেল, তাল মালা, নাদাই প্রভৃতি ব্যবহার দেখা যায়।

তিন: কৃতিসমূহ

কার্নাটিক সঙ্গীতে বিভিন্ন ধরনের গীত বা কম্পোজিশন আছে:

গীতম (Gitam): শিক্ষার প্রাথমিক ধাপের জন্য সরল গান।

স্বরজতী: একটু জটিল ও রাগভিত্তিক।

ভরণম (Varnam): রাগ ও তাল উভয়ের পূর্ণ ব্যবহার সহ গান।

কৃতি – কীর্তনা (Kriti-Kirtanam): মূলভিত্তিক রচনাসমূহ, ভক্তিমূলক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা হয়।

চার: সঙ্গীতের ইতিহাসে তিন মহান সঙ্গীতাচার্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ (ত্যাগরাজ, মুথুস্বামী দীক্ষিতর, শ্যাম শাস্ত্রী)। এ ছাড়া ও আরো অনেক রচয়িতার সঙ্গীত ব্যবহার করা হয়।

উপসংহার

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত একটি জীবন্ত ঐতিহ্য, যা কালের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলালেও তার গভীরতা ও আধ্যাত্মিকতা অটুট থেকেছে। এটি কেবল সুর ও তাল নয়, হৃদয় ও আত্মার সংযোগ। এই সংগীতের সাধনা, এর দর্শন এবং এর অনুভব আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত। এটি কেবল এক প্রকার শিল্প নয়, বরং এটি একটি দর্শন, যা আমাদের আত্মিক উন্নয়নের পথ দেখায়। সুরের মধ্যে নিহিত সেই গভীরতা, ছন্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিয়ম এবং রাগের আবেগ আমাদের জীবনের প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে একাত্ম হয়।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত তাই কেবল শ্রবণের নয়, অনুভবের—এটি এক চিরন্তন সাধনার পথ।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

আরও পড়ুন

error: Content is protected !!
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x